সল্টলেক, ২৭ জুন: সরকারি পুর কার্যালয় নাকি কোনও বিলাসবহুল হোটেলের গোপন শয়নকক্ষ— তা চট করে বোঝার উপায় নেই। সল্টলেকের বিধাননগর পুরনিগমের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের দলীয় কার্যালয়টি খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই কার্যত চক্ষু চড়কগাছ হলেন এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই ওয়ার্ড কার্যালয়টির দরজা খোলামাত্রই ভিতরে ফাইলের স্তূপের বদলে দেখা গেল সারি সারি ঝাঁ-চকচকে সোফা, পাঁচ-পাঁচটি এসি (AC), বিলাসবহুল খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল এবং আলমারি ও ড্রয়ারের ভেতর থেকে উদ্ধার হলো থরে থরে সাজানো নরম কম্বল, বালিশ ও আপত্তিকর গর্ভনিরোধক সামগ্রী (কন্ডোমের প্যাকেট)। পুর অফিসের ভেতরে বিলাসিতা ও অনৈতিক কাজের এমন চরম নিদর্শন দেখে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
ছাব্বিশের (২০২৬) বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই এলাকা ছেড়ে বেপাত্তা বিধাননগরের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিতর্কিত প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর জয়দেব নস্কর। দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিলর লাপাত্তা থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ করছিলেন যে, ওয়ার্ডের সাধারণ নাগরিক পরিষেবা ও পুরকাজ সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। জনগণের সেই অভাব-অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে এবং পুর পরিষেবা সচল করার লক্ষ্যেই শনিবার আকস্মিক পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা স্থানীয় বিধায়ক চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু কার্যালয়ের তালা খুলে ভিতরে ঢোকা মাত্রই সেখানে কাউন্সিলরের ঘরের রূপ দেখে উপস্থিত সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খোদ মন্ত্রীর চোখ কপালে ওঠে।
“এ জিনিস দেখাও পাপ!” ওয়ার্ড অফিসের ভেতর যা দেখে হতবাক বিধায়ক ও মন্ত্রী:
সরকারি অর্থে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি জনপরিষেবা কেন্দ্রকে কীভাবে ব্যক্তিগত আমোদপ্রমোদের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল, পরিদর্শনে গিয়ে তার যে রূপ সামনে এলো:
-
লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্টের ছোঁয়া: অফিসের বাইরের ঘরে সাজানো রয়েছে দামি দামি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল সোফা সেট। গোটা কার্যালয়টি ঠান্ডা রাখতে বসানো রয়েছে ৫টিরও বেশি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (AC)।
-
সুসজ্জিত বেডরুম ও প্রসাধন সামগ্রী: কাউন্সিলরের নির্দিষ্ট ঘরে টেবিল-চেয়ার বা বইয়ের আলমারির পরিবর্তে দেখা মেলে একটি সুসজ্জিত খাট, চাদর, দামি আলমারি এবং মহিলাদের ব্যবহার্য ড্রেসিং টেবিল। আলমারি খুলতেই ফাইলের পরিবর্তে বের হয় থরে থরে সাজানো কম্বল ও নরম বালিশ।
-
আপত্তিকর সামগ্রী উদ্ধার: সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ঘরের ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার ও আলমারির ভেতর থেকে উদ্ধার হয় কন্ডোমের প্যাকেট, যা দেখে তীব্র অস্বস্তিতে পড়েন উপস্থিত সকলে।
সরকারি কার্যালয়ের এই নজিরবিহীন অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয় দেখে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসক শারদ্বত মুখোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন:
“আমি প্রথমে ভিতরে ঢুকে বুঝতেই পারছিলাম না এটা কোনও কাউন্সিলরের সরকারি পুর কার্যালয় নাকি কারও ব্যক্তিগত শয়নকক্ষ (বেডরুম)! সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি একটা অফিসকে কোন উদ্দেশ্যে এভাবে ব্যবহার করা হতো, তা এখন জলের মতো স্পষ্ট। একজন চিকিৎসক এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে বলব— এ জিনিস দেখাও পাপ। ক্ষমতার এই চূড়ান্ত অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিগত জমানায় এই পুর কার্যালয়টিকে সাধারণ মানুষের কাজের জন্য ব্যবহার না করে, ক্ষমতার দম্ভে এবং বহিরাগতদের নিয়ে রাতভর অনৈতিক কাজকর্ম চালানোর সেফ হাউস হিসেবে ব্যবহার করতেন জয়দেব নস্কর ও তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্ত। ভোটের পর কাউন্সিলর পলাতক হলেও, আজ তাঁর এই ‘বিলাসবহুল সাম্রাজ্য’ জনসমক্ষে চলে আসায় সল্টলেক জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও ধিক্কারের ঝড় উঠেছে। এই রাজকীয় অফিস তৈরিতে সরকারি তহবিলের টাকা নয়ছয় হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিধাননগর পুর কর্তৃপক্ষকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







