কলকাতা, ২৯ জুন: বেশ কিছুদিন ধরে ভেতরে ভেতরে চলা তীব্র বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কলকাতা ইসকনের (ISKCON) সহ-সভাপতি রাধারমণ দাসকে তাঁর সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে আচমকা পদচ্যুত করা হলো। শনিবার রাতে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকন কর্তৃপক্ষের তরফে এই বড়সড় সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। এই চরম পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে ইসকনের কোনও প্রাতিষ্ঠানিক পদের সঙ্গে আর সরাসরি যুক্ত রইলেন না রাধারমণ দাস। হঠাৎ কেন তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তা নিয়ে নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে একটি দীর্ঘ পোস্ট করে প্রধান ৬টি সম্ভাব্য কারণ নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
ইসকনের প্রতিনিধি হিসেবে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও, পদ হারানোর পর তিনি জানিয়েছেন যে ইসকনের সঙ্গে তাঁর আত্মিক টান একই থাকবে এবং তিনি এই প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন। রাধারমণ দাসের নিজস্ব বক্তব্য এবং এক্স হ্যান্ডেলের পোস্ট অনুযায়ী, যে ৬টি প্রধান কারণে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়েছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, ২০২৩ সালে বিজেপি সাংসদ তথা পশুপ্রেমী নেত্রী মানেকা গান্ধী ইসকনের গোরশালাগুলির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তোলেন এবং ইসকনকে ‘দেশের সবচেয়ে বড় প্রতারক’ বলে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন। বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি ভক্তের ভাবাবেগে আঘাত লাগায় ইসকন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে মানেকা গান্ধীর বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার মানহানির আইনি নোটিস পাঠিয়েছিলেন রাধারমণ দাস, যা ইসকন ভালো চোখে নেয়নি।
দ্বিতীয়ত, প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দুদের ওপর সাম্প্রতিক নানা নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অত্যন্ত কড়া ভাষায় ধারাবাহিক প্রতিবাদ ও সুর চড়িয়েছিলেন রাধারমণ দাস। তাঁর এই অতি-সক্রিয় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক স্তরে ইসকনের আধ্যাত্মিক ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির পরিপন্থী বলে মনে করেছিল শীর্ষ নেতৃত্ব।
তৃতীয়ত, কৌতুকশিল্পী সুরলিন কৌর ইসকন ও সনাতন ধর্মকে নিয়ে একটি বিতর্কিত ও আপত্তিকর মন্তব্য করেছিলেন। সেই সময়েও ইসকনের বাকি আধিকারিকদের অপেক্ষা না করে রাধারমণ দাস নিজেই প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে ওই কৌতুকশিল্পীর বিরুদ্ধে আইনি ও সামাজিক স্তরে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
চতুর্থত, কট্টরপন্থী সনাতনীদের বিভিন্ন প্রকাশ্য মন্তব্য ও কট্টর হিন্দুত্ববাদের সমর্থন নিয়েও সমাজমাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করেছিলেন রাধারমণ দাস। একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংগঠন হিসেবে ইসকন সবসময় কট্টরপন্থা থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে চায়, তাই তাঁর এই অবস্থান সংগঠনের নীতিবিরুদ্ধ বলে বিবেচিত হয়।
পঞ্চমত, ২০২৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হওয়া প্রাণঘাতী হামলার পর রাধারমণ দাস একটি অদ্ভুত দাবি করে বসেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ১৯৭৬ সালে নিউ ইয়র্কে প্রথমবার যখন জগন্নাথদেবের রথযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিশেষ উদ্যোক্তা ছিলেন এবং স্বয়ং জগন্নাথদেবের আশীর্বাদেই ২০২৪ সালে ট্রাম্পের প্রাণরক্ষা হয়েছে। এই অলৌকিক ও রাজনৈতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক স্তরে ইসকনকে চরম বিতর্কের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
ষষ্ঠত, গত ২৯ মে একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন রাধারমণ দাস। ইসকন কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নির্দেশিকা ছিল যে, অনুমতি ছাড়া সংগঠনের নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে মুখ খোলা যাবে না। তাঁর সেই সাক্ষাৎকারকে চূড়ান্ত ‘ইসকন বিরোধী আচরণ’ এবং নিয়মভঙ্গ হিসেবে গণ্য করেই শনিবার রাতে তাঁকে পদচ্যুত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519






