কলকাতা, ২৭ জুন: রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর দুর্নীতি ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে নবান্নের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কোপ এবার সরাসরি গিয়ে পড়ল কলকাতা পুরসভার (KMC) আরও এক দাপুটে ও হেভিওয়েট প্রাক্তন তৃণমূল নেতার ওপর। জবরদস্তি ভেরি দখল, তোলাবাজি, মারধর এবং এক মহিলার শ্লীলতাহানির চেষ্টার মতো একাধিক গুরুতর ও জামিন অযোগ্য অপরাধে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গতকাল গভীর রাতে কলকাতা পুরসভার ১০৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা বোরো ১১-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান তারকেশ্বর চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করল সার্ভে পার্ক থানার পুলিশ। আজ, শনিবার ধৃত এই প্রভাবশালী প্রাক্তন কাউন্সিলরকে কড়া সুরক্ষায় আলিপুর আদালতে পেশ করা হবে বলে লালবাজার সূত্রে জানা গেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতায় থাকাকালীন দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায়, বিশেষ করে সার্ভে পার্ক ও আনন্দপুর থানা সংলগ্ন অঞ্চলের জলাশয় ও ভেরি বেআইনিভাবে বুজিয়ে প্রোমোটিং চক্র চালানো এবং সিন্ডিকেট রাজ কায়েম করার ক্ষেত্রে তারকেশ্বর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ভূরি ভূরি অভিযোগ জমা পড়ছিল। সম্প্রতি সার্ভে পার্ক থানায় এক ভুক্তভোগী পরিবার তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিতভাবে জোরপূর্বক ভেরি দখল, ভয় দেখিয়ে তোলা আদায়, বেআইনিভাবে আটকে রেখে মারধর এবং শ্লীলতাহানির চেষ্টার লিখিত এফআইআর (FIR) দায়ের করেন। সেই চাঞ্চল্যকর অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্তে নেমে গতকাল মধ্যরাতে পুলিশি হানায় হাতেনাতে পাকড়াও করা হয় এই প্রাক্তন বোরো চেয়ারম্যানকে।
সম্পত্তির খতিয়ান ও তদন্তে পুলিশের রাডার:
সার্ভে পার্ক থানা ও লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তারকেশ্বর চক্রবর্তীকে গ্রেফতারের পর কেবল এই ফৌজদারি মামলাই নয়, বরং তাঁর বিপুল আর্থিক সাম্রাজ্যের দিকেও নজর পড়েছে প্রশাসনের:
-
বেআইনি সম্পত্তির তদন্ত: অভিযোগ উঠেছে, বিগত কয়েক বছরে তোলাবাজি ও বেআইনি ভেরি দখলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন এই কাউন্সিলর ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সাঙ্গোপাঙ্গরা। তাঁর এই বিপুল আয়ের উৎস কী, তা খতিয়ে দেখতে তাঁর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে পুলিশ।
-
সহযোগীদের খোঁজ: এই বড়সড় তোলাবাজি সিন্ডিকেটের পেছনে পূর্বপরিকল্পিতভাবে কোনও বড় ষড়যন্ত্র কাজ করছিল কি না এবং এর পেছনে কলকাতা পুরসভার আর কোনও শীর্ষ আধিকারিক বা নেতার যোগ রয়েছে কি না, তাও তদন্তের পরিধিতে আনা হচ্ছে।
“তৃণমূলে চোর ছাড়া একটাও লোক নেই”, তারকেশ্বরের গ্রেফতারে তীব্র তোপ রাহুল সিনহার:
তারকেশ্বর চক্রবর্তীর এই হাই-প্রোফাইল গ্রেফতারির খবর সামনে আসতেই নব্য তৃণমূল শিবিরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ শানিয়েছেন প্রবীণ বিজেপি সাংসদ রাহুল সিনহা। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি কটাক্ষের সুরে বলেন:
“তৃণমূল কংগ্রেসে চোর ছাড়া একটাও ভালো লোক নেই। এই দলে এতদিন ধরে শুধু চুরি বিদ্যা আর তোলাবাজির প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ওপর তলার নেতাদের চুরির ভাগ দেওয়ার জন্য রূঢ় ও লাগামছাড়া দুর্নীতি চালানো হয়েছে বাংলায়। বিগত জমানায় দুর্নীতি করলেই সাত খুন মাফ করে দেওয়া হতো, এটাই ছিল তৃণমূলের মূল নীতি। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার আইনকে আইনের পথে চলতে দিচ্ছে, তাই খুব দ্রুত আরও অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতাকে জেলের ভাত খেতে হবে।”
রাজনৈতিক মহলের মতে, দক্ষিণ কলকাতার আনন্দপুর-সার্ভে পার্ক বেল্টের জলাভূমি ও ভেরি দখলের রাজনীতিতে তারকেশ্বর চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এক নাম। তাঁর এই আকস্মিক গ্রেফতারে একদিকে যেমন এলাকার জমি মাফিয়া ও সিন্ডিকেট চক্রের ওপর এক বিরাট প্রশাসনিক ধাক্কা বসল, ঠিক তেমনই আইনি জাঁতাকলে পড়ে ভবানীপুর শিবিরের বিড়ম্বনা আরও একদফা বৃদ্ধি পেল।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







