কলকাতা, ২৪ জুন: রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ‘নয়া তৃণমূল’ ও ‘আসল তৃণমূল’-এর তীব্র দ্বন্দ্বে যখন তাসের ঘরের মতো ভাঙছে ঘাসফুল শিবির, ঠিক তখনই নিজের পুরনো লড়াকু ভাবমূর্তি ও গণসংযোগ ফিরে পেতে এক চূড়ান্ত মরিয়া রাজনৈতিক কৌশল নিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একের পর এক বিধায়ক ও হেভিওয়েট কাউন্সিলর যেভাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিচ্ছেন, সেই আবহে দলের ক্ষুব্ধ নিচুতলার কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখতে এবং ক্ষতে প্রলেপ দিতে এবার থেকে প্রতিদিন কালীঘাটে নিজের বাসভবনেই ‘জনতার দরবার’ (Janatar Darbar) করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন মমতা। ভবানীপুরের দলীয় কার্যালয় ও বাসভবন থেকেই এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি সরাসরি মানুষের মুখোমুখি হবেন, যা বাংলায় তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের শুরুর দিনগুলির আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ছাব্বিশের (২০২৬) বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় ভরাডুবির পর থেকেই পিকে-র সংস্থা ‘আইপ্যাক’ (I-PAC)-এর বিরুদ্ধে একের পর এক প্রবীণ তৃণমূল নেতা প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে কালীঘাট শিবির এক বড়সড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কর্পোরেট স্টাইলে দল চালাতে গিয়ে আর কোনও পেশাদার ভোটকুশলী সংস্থার উপর একশো শতাংশ ভরসা করা হবে না।
নেতাদের টার্গেট হওয়া রুখতে ও সংগঠন বাঁচাতে ৩ দফা কৌশল:
বিদ্রোহী শিবিরের ক্রমাগত ভাঙন এবং নবান্নের পুলিশি ও আইনি তৎপরতার মুখে দলের রাশ ধরে রাখতে মমতা-পন্থী তৃণমূল মূলত এই তিন স্তরের ড্যামেজ কন্ট্রোল স্ট্র্যাটেজি সাজিয়েছে:
-
নেতা মনোনয়নে ধীর চলো নীতি: সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব বাদে জেলা ও ব্লক স্তরের বাকি কমিটিতে নতুন করে নেতাদের নাম মনোনীত করার ক্ষেত্রে কোনও তাড়াহুড়ো করা হবে না; যাতে নতুন করে তালিকায় আসা নেতারা বিরোধী শিবিরের বা প্রশাসনের সরাসরি টার্গেটে পরিণত না হন।
-
আইনি লড়াইয়ে সময় নেওয়া: দলত্যাগীদের নিয়ে এখনই আদালত বা নির্বাচন কমিশনের (ECI) দরজায় ছুটে গিয়ে সময় নষ্ট করতে চাইছে না পুরনো শিবির। তাঁদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা— ভয় দেখিয়ে এবং বিপুল টাকার লোভ দেখিয়েই মূলত দল ভাঙানো হচ্ছে, যার জবাব মানুষই দেবে।
-
আইপ্যাক-মুক্ত খাঁটি সংগঠন: কর্পোরেট এজেন্সির ছক ভেঙে দলের পুরনো ও বিশ্বস্ত নেতাদের দিয়ে আগের মতো মাটি কামড়ে পড়ে থাকা সংগঠন মজবুত করাই এখন ভবানীপুরের মূল লক্ষ্য।
রোজ ৪ ঘণ্টা সরাসরি মানুষের দরবারে সুপ্রিমো:
দলের প্রথম সারির নেতারা যখন দলে দলে হাত ছাড়ছেন, তখন কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং ছেড়ে সাধারণ মানুষের উপরই শেষ ভরসা রাখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন সূচি অনুযায়ী, এবার থেকে প্রতিদিন দুপুর ৩টে থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত একটানা চার ঘণ্টা কালীঘাটের বাসভবনে ‘জনতার দরবার’-এ বসবেন তৃণমূল সুপ্রিমো। এই নির্দিষ্ট সময়ে দলের সাধারণ কর্মী, বুথ স্তরের সংগঠক এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি দিদির কাছে এসে তাঁদের অভাব-অভিযোগ, ক্ষোভ ও পরামর্শের কথা জানাতে পারবেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভায় সংখ্যাতত্ত্বের লড়াইয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে গেলেও, রোজ ৪ ঘণ্টার এই নিবিড় গণসংযোগের মাধ্যমে নিচুতলার কর্মীদের আবেগ ধরে রেখে ২০২৬-এর পরবর্তী রাজনৈতিক লড়াইয়ের জমি নতুন করে প্রস্তুত করতে চাইছেন মমতা।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







