কলকাতা, ২৪ জুন: বিশ্বকাপের দীর্ঘ ৯৬ বছরের ইতিহাসে ভারত কোনওদিন মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি ঠিকই, তবে ফুটবলকে কেন্দ্র করে আসমুদ্রহিমাচলের, বিশেষ করে আপামর বাঙালির যে আকাশছোঁয়া উন্মাদনা— তাকে এবার কুর্নিশ জানাল স্বয়ং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফা (FIFA)। কলকাতার উত্তর প্রান্তের ঐতিহ্যবাহী ফড়িয়াপুকুর এলাকার একঝাঁক ফুটবলপ্রেমী যুবকের হাতের জাদুতে রাঙিয়ে ওঠা ‘ফুটবল পাড়া’র দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতির ছবি নিজেদের অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছে ফিফা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম ভারতের কোনও প্রান্তের ফুটবল আবেগের ছবি বিশ্বমঞ্চে এভাবে ভাগ করে নিল ফিফা, যা ঘটি-বাঙালের ফুটবল ম্যাচ দেখার উন্মাদনাকে রাতারাতি এক আন্তর্জাতিক অনন্য স্বীকৃতি এনে দিল।
চলতি দেড় মাস ব্যাপী বিশ্বকাপের আবহে কলকাতার আর পাঁচটা পাড়ার মতোই নাগরিকত্ব বদলে ফেলেছিল ফড়িয়াপুকুরও। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগাল— প্রিয় দলের রঙে নিজেদের পাড়াকে মুড়ে ফেলতে ফড়িয়াপুকুরের জনা পনেরো কিশোর ও যুবক দিনরাত এক করে তুলির টানে সাজিয়ে তুলেছিলেন এলাকার সমস্ত দেওয়াল। কলকাতার এই নান্দনিক ফুটবল কোলাজের ছবি বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার নজর কাড়তেই তারা ফড়িয়াপুকুরের গ্রাফিতির ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখে: ‘সরকারিভাবে ভারতে বিশ্বকাপ-পর্ব শুরু হয়েছে’।
প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক গণ্ডি পেরিয়ে ঐতিহ্যের লড়াই:
ফড়িয়াপুকুরের এই দেওয়ালচিত্রের নেপথ্যে থাকা মূল কারিগর বা ‘শিল্পী’রা হলেন রাজ কাহার, সুশান্ত দাস, চন্দন শর্মা, দীপকুমার বাহাদুর এবং রাজীব লাসরা। বিশ্বমঞ্চে এই নজিরবিহীন সমাদর পাওয়ার পর উচ্ছ্বসিত রাজ কাহার এই রেওয়াজের ইতিহাস খতিয়ে দেখতে গিয়ে জানান:
-
সূচনা ২০১০ সালে: ২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সময় একটি বহুজাতিক স্পনসর সংস্থার উদ্যোগে কলকাতায় ‘পাড়া সাজানো প্রতিযোগিতা’র আয়োজন করা হয়েছিল। তখন থেকেই ফড়িয়াপুকুরের যুবকেরা প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বকাপ এলেই তুলি-রং নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন।
-
বাণিজ্যিক স্পনসরহীন ফুটবল প্রেম: গত বিশ্বকাপ পর্যন্ত সেই বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা চালু থাকলেও, এবার তেমন কোনও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়নি। কিন্তু প্রতিযোগিতার পুরস্কার বা স্পনসরশিপ না থাকলেও, স্রেফ ফুটবলের প্রতি খাঁটি ভালোবাসা ও রেওয়াজ ধরে রাখতেই নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে এবারও পাড়া সাজিয়েছিলেন তাঁরা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই পোস্ট দেখার পর থেকেই ফড়িয়াপুকুর চত্বরে কার্যত অকাল দেওয়ালি শুরু হয়ে গিয়েছে। পাড়ার অলিগলিতে ভিড় জমাচ্ছেন কলকাতার অন্য প্রান্তের ফুটবলপ্রেমী মানুষ ও নাগরিক মহল। ফিফার এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রসঙ্গে শিল্পী রাজ কাহার আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “ফিফা আমাদের পাড়ার দেওয়ালের ছবি পোস্ট করার পর বন্ধুরা যখন লিংক পাঠাল, আমরা নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটা আমাদের এত বছরের খাটনি আর ফুটবল প্রেমের এক বিরাট বড় ট্রফি। এই অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়; আজ আমাদের পুরো পাড়া গর্বিত।” ফিফার এই একটি মাত্র পোস্টের হাত ধরে আরও একবার প্রমাণিত হলো যে, মাঠের সবুজ ঘাসে ভারত না থাকলেও, গ্যালারি আর ফুটবলের স্পন্দনে বাঙালি সবসময়ই বিশ্ব ফুটবলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







