দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে আছড়ে পড়া দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘ডাবলেট’ (Doublet) ভূমিকম্পের জেরে এক নজিরবিহীন ও প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। রিখটার স্কেলে যথাক্রমে ৭.২ এবং ৭.৫ তীব্রতার এই জোড়া ভূ-কম্পনের ধাক্কায় রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আকস্মিক এই মহাবিপর্যয়ে ইতিমধ্যেই অন্তত ১০ হাজার মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ চাপা পড়ে থাকায় এই সংখ্যা আরও লাফিয়ে বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ভেনিজুয়েলা সরকার দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা (State of Emergency) জারি করেছে। ভারতীয় সময় অনুযায়ী বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ সুদূর লাতিন আমেরিকার এই দেশে প্রথম কম্পনটি অনুভূত হয়।
ভূ-তত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়টি আর পাঁচটা সাধারণ ভূমিকম্পের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সাধারণত বড় ভূমিকম্পের পর একাধিক ‘আফটার শক’ বা মৃদু অনুকম্পন দেখা যায়, কিন্তু ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ডাবলেট আর্থকোয়েক’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে মূলত রিখটার স্কেলে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় কম্পনটিই ছিল মূল ভূমিকম্প এবং তার মাত্র ৩৯ সেকেন্ড আগে হওয়া ৭.২ মাত্রার প্রথম কম্পনটি ছিল আসলে একটি শক্তিশালী ‘ফোর শক’ (Foreshock)।
মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড রাজধানী, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে শিউরে ওঠার মতো অভিজ্ঞতা:
স্থানীয় উদ্ধারকারী দল ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সূত্রে এই বিপর্যয়ের যে ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
-
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও অন্ধকার: প্রথম দফার ঝাঁকুনিতেই কারাকাসের একাধিক বহুতল ও আবাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে গোটা দেশের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চারপাশ সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে যায়।
-
নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ মেলেনি: প্রথম কম্পনের পর সাধারণ মানুষ কী ঘটছে তা বুঝে উঠে খোলা আকাশের নিচে বা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সামান্যতম সুযোগ পাওয়ার আগেই দ্বিতীয় তীব্র কম্পনটি আঘাত হানে, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
-
ব্যাঙ্ক কর্মীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা: কারাকাসের ৫৪ বছর বয়সী এক ব্যাঙ্ক কর্মী ওদালিস এসকালোনা একটি সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর শিউরে ওঠার মতো অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, “হঠাৎ করে চোখের সামনে দেখলাম বহুতলের সিঁড়িগুলো ভেঙে মূল কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। পুরো দেওয়ালে বড় বড় ফাটল ধরে গেল এবং সিলিং থেকে সমস্ত জিনিসপত্র হুড়মুড় করে মাথার ওপর ভেঙে পড়তে শুরু করল। চারিদিকে শুধু কান্নার আওয়াজ, অত্যন্ত ভয়াবহ এক নরক গুলজার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।”
বর্তমানে ভেনিজুয়েলার সেনা, বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলি যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কারাকাসের ভেঙে পড়া বহুতলগুলির নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিদ্যুৎহীনতা এবং রাস্তাঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়ায় উপদ্রুত এলাকাগুলিতে পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। বিশ্বজুড়ে এই মুহূর্তে ভেনিজুয়েলার এই চরম মানবিক সঙ্কটে পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক স্তরে ত্রাণ ও চিকিৎসার সাহায্য পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







