best news portal development company in india

বিষ্ণুপুরের মন্দির: এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী ও সংরক্ষণের অভাবের করুণ আলেখ্য

SHARE:

ঐতিহাসিক প্রতিবেদন, ২৯ জুন: ‘বিষ্ণুপুর’ নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাঢ় বাংলার লাল মাটির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী— মল্লরাজাদের অমর সৃষ্টি ‘টেরাকোটা মন্দির’ সম্ভার। লাতিন শব্দ ‘টেরা’ (যার অর্থ মাটি) এবং ‘কোটা’ (যার অর্থ পোড়ানো)— এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তৈরি পোড়ামাটির এই শিল্পকলা বাংলার সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিষ্ণুপুরের মন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে টেরাকোটার কারুকার্যে ফুটে উঠেছে পুরাণের কাহিনি, ঐতিহাসিক যুদ্ধ, রাজকীয় নৌকাবিহার, বিবিধ জীবজন্তু এবং তৎকালীন ঔপনিবেশিক সমাজচিত্র। স্থাপত্যের গঠনশৈলী অনুযায়ী বাংলার এই মন্দিরগুলিকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়— চালা, রত্ন, দালান এবং দেউল।

ইতিহাসের পাতায় মল্লরাজ বীর হাম্বিরের নির্মিত রাসমঞ্চ, শ্যামরায় মন্দির, জোড়বাংলা মন্দির কিংবা মদনমোহন মন্দিরের নাম বিশ্বখ্যাত হলেও, এর বাইরেও বিষ্ণুপুরে ছড়িয়ে রয়েছে এমন বহু প্রাচীন সৌধ ও মন্দির, যেগুলি আজ প্রচারের আলো থেকে দূরে এবং চরম অবহেলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোনও প্রতিষ্ঠা ফলক না থাকায় এদের সম্পূর্ণ ইতিহাস জানা না গেলেও, এই মন্দিরগুলির পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে মল্ল রাজবংশের উত্থান-পতনের কাহিনি।

বিস্মৃতির অন্তরালে থাকা বিষ্ণুপুরের কিছু প্রাচীন দেবালয়:

  • শ্রী শ্রী মহাপ্রভু জীউ-র মন্দির: বিষ্ণুপুরের অত্যন্ত প্রাচীন এই মন্দিরটি আনুমানিক ষোড়শ শতকে মহারাজ গোপাল সিংহ প্রতিষ্ঠা করেন। ‘জোড়বাংলা’ রীতিতে নির্মিত এই মন্দিরের গৌরব আজ অতীত। কালের নিয়মে এর দেওয়ালের সূক্ষ্ম টেরাকোটার কাজ আর প্রায় অবশিষ্ট নেই বললেই চলে।

  • যুগোল কিশোর কৃষ্ণবলরামের মন্দির: বিখ্যাত মৃন্ময়ী মন্দিরে যাওয়ার পথে রাস্তার বাঁদিকে যুগোল কিশোরের এই দুটি প্রাচীন মন্দির অবস্থিত। ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী ‘দেউল’ রীতির আদলে নির্মিত এই মন্দির দুটি আনুমানিক অষ্টাদশ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল। মন্দিরের গায়ে আজও কিছু প্রাচীন টেরাকোটার কাজ টিকে থাকলেও, বর্তমানে পুরো মন্দির চত্বর আগাছায় ভরে গিয়েছে এবং সংলগ্ন রাস্তা লতাপাতায় ঢেকে গিয়েছে।

  • নামহীন পঞ্চরত্ন মন্দির: মদনমোহন মন্দিরে যাওয়ার পথে রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক জীর্ণ পঞ্চরত্ন শৈলীর মন্দির। মন্দিরের চূড়াটি ওড়িশার রেখ দেউল রীতির অনুকরণে তৈরি। বর্তমানে এই মন্দিরে কোনও বিগ্রহ বা মূর্তি নেই। ভগ্নপ্রায় এই মন্দিরের দুই-তিনটি শিখর বাদে বাকিগুলি ভেঙে পড়েছে। মন্দিরের প্রবেশপথ ও সামনের দেওয়ালটুকু ছাড়া বাকি অংশ লতাপাতা ও আগাছায় এমনভাবে ঢেকে গিয়েছে যে এর বিস্তৃত বিবরণ দেওয়াও আজ অসম্ভব।

লালবাঈ মহল ও লালবাঁধের রক্তঝরা ইতিহাস:

বিষ্ণুপুরের মল্ল ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে ‘লালবাঈ মহল’ বা ‘নতুন মহল’-এর ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে। ইতিহাস অনুযায়ী, ওড়িশার পাঠান সর্দার রহিম খাঁর ধনরত্ন লুঠ করার সময় বেগম লালবাঈকেও বন্দী করে বিষ্ণুপুরে নিয়ে আসেন মল্লরাজ দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ। পরবর্তীতে লালবাঈ রাজার প্রতি অনুরক্ত হলে, রাজা তাঁর জন্য এই বিলাসবহুল নতুন মহলটি নির্মাণ করে দেন।

কিন্তু এই প্রেমকাহিনির পরিণতি ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। কথিত আছে, দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের প্রধান রানি ঈর্ষা ও ক্ষোভের বশে লালবাঈকে বর্তমানের ‘লালবাঁধ’ দিঘির জলে ডুবিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। সেই থেকে এই দিঘির নাম হয় ‘লালবাঁধ’। আজ সেই লালবাঈ মহল শুধুই এক ভগ্নস্তূপ, যা পর্যটকদের দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

বিষ্ণুপুরের এই ঐতিহাসিক অমূল্য সম্পদগুলি আজ যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুরাতাত্ত্বিক সংরক্ষণের অভাবে ধুঁকছে। আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বিষ্ণুপুরের নাম উজ্জ্বল হলেও, স্থানীয় এই প্রাচীন মন্দির ও মহলগুলিকে যদি দ্রুত সংস্কার না করা হয়, তবে অচিরেই বাংলার টেরাকোটা ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ইতিহাসপ্রেমী ও বিশেষজ্ঞরা।

Supravat Bangla
Author: Supravat Bangla

PRGI Approved - WBBEN/25/A1519

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

best news portal development company in india
best news portal development company in india
सबसे ज्यादा पड़ गई