কলকাতা, ১৬ জুলাই ২০২৬: বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর যখন প্রায় প্রতিদিনই ‘কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেস’ থেকে বড় বড় হেভিওয়েট নেতারা পিঠ বাঁচাতে ওপার শিবিরে চলে যাচ্ছেন, তখন সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আরও একবার নিজের চেনা লড়াকু মেজাজে গর্জে উঠলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সেনাপতি তথা কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরে যোগ দেওয়ায় কালীঘাট যে এক অপূরণীয় ধাক্কা খেয়েছে, তা মানছে রাজনৈতিক মহল। তবে এই চরম ছন্নছাড়া ও বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতেও ‘শূন্য’ থেকে নতুন করে লড়াই শুরু করার অঙ্গীকার করলেন তৃণমূল সুপ্রিমো।
বুধবার রাতে নিজের অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন বার্তায় দলত্যাগীদের তীব্র ভাষায় ‘বেইমান’ বলে কটাক্ষ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে, বিগত দিনে এই সমস্ত নেতাদের অতি-প্রাধান্য দেওয়ার জন্য বাংলার মানুষের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমাও চেয়ে নেন তিনি।
“১৯৯৭ সালে একা ছিলাম, বেইমানদের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী”
সোশ্যাল মিডিয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই বিস্ফোরক ও লড়াকু বার্তাটি নিচে তুলে ধরা হলো:
“আপনারা কোনও ব্যক্তিবিশেষকে দেখে নয়, দলের জোড়াফুল প্রতীক এবং আদর্শ দেখে ভোট দিয়েছিলেন। আজ যাঁরা নিজেদের স্বার্থে ও ব্যক্তিগত চামড়া বাঁচাতে দল ছেড়ে পালাচ্ছেন, সেই বেইমানদের দলে রাখার জন্য আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। পিছন থেকে ছুরি মারা এই লোকেদের চিনে রাখুন। ১৯৯৭ সালে যখন কংগ্রেস ভেঙে দল তৈরি করি, তখন আমি সম্পূর্ণ একা ছিলাম। শূন্য থেকে লড়াই করে দলটাকে এই জায়গায় এনেছি। আজ তো তাও আমাদের ১৮ জন লড়াকু সাংসদ আছেন, হাজার হাজার সৎ বিধায়ক ও কোটি কোটি একনিষ্ঠ কর্মী আছেন। ১৯৯৭ সালে যদি একা লড়ে রাজ্য কাঁপাতে পারি, তবে ২০২৬ সালেও নতুন করে শূন্য থেকে লড়াই শুরু করার ক্ষমতা ও দম আমি রাখি।”
“অভিষেক তো বাহানা, ও আগামী ৫০ বছর লড়াই করবে”
বুধবার সকালে বিধানসভায় ঋতব্রত ও অনুব্রত মণ্ডলের পাশে বসে মদন মিত্র দাবি করেছিলেন যে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঔদ্ধত্য ও ভুল নীতির কারণেই তৃণমূল আজ ধ্বংসের মুখে। মদনের এই অভিযোগকে নস্যাৎ করে আজ ভাইপোর পিঠে সম্পূর্ণ আস্থার হাত রাখলেন মমতা।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে দলনেত্রীর কড়া জবাব:
-
অভিষেক স্রেফ অজুহাত: “অভিষেক তো আসলে ওপার শিবিরে যাওয়ার একটা বাহানা মাত্র। ওর যদি অতীতে কোনও ভুল হয়েও থাকে, সেই ভুল অনেক আগেই মাফ হয়ে গিয়েছে। ও আজ বুক চিতিয়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সির বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে এবং আগামী ৫০ বছর বাংলার মানুষের জন্য লড়ে যাবে।”
-
ইডি-র ভয়েই খাটিয়া শরণ: মদন মিত্রের নাম না করে মমতা বলেন, “কাউকে ভালোবেসে বা আদর্শের টানে ওপারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না, স্রেফ কেন্দ্রীয় এজেন্সির জুজু আর ভয় দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গতকালই ওঁর ছেলে আর স্ত্রীর নামে ইডি নোটিস পাঠিয়েছে। আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম এমন কিছু ঘটবে, তাই ওঁর পরিবারকে সমন করতেই উনি আত্মসমর্পণ করলেন। সেই কারণেই আগেই ওনাকে দলের সব পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
১ মাস ২২ দিনের সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের স্মৃতি
দলের জন্মলগ্নের চরম কঠিন দিনগুলির কথা মনে করিয়ে দিয়ে নিচুতলার কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন মমতা। তিনি মনে করিয়ে দেন, ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর মাত্র ১ মাস ২২ দিনের মাথায় দলের নিজস্ব প্রতীক নিয়ে লোকসভা নির্বাচনে লড়াই করে বাজিমাত করেছিলেন তাঁরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একুশে জুলাই শহিদ দিবসের ঠিক আগে মদন মিত্রের মতো মাস-লিডারের দলবদল এবং পাল্টা শিবিরের একুশের প্রস্তুতি নবান্ন ও কালীঘাটের স্নায়ুযুদ্ধকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। তবে মমতার এই ‘শূন্য থেকে শুরু’ করার হুঙ্কার প্রমাণ করছে, সামনের দিনগুলিতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনেও সহজে জমি ছাড়বেন না তিনি।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







