আর জি কর (RG Kar) কাণ্ডের পুরনো ফাইল নতুন সরকারের আমলে পুনরায় খোলামাত্রই রাজ্যের চিকিৎসা মহলে তৈরি হয়েছে তীব্র কম্পন। আর তার প্রথম বড়সড় ধাক্কায় এবার স্থায়ীভাবে সরকারি চাকরি খোয়াতে হলো বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের প্যাথোলজি বিভাগের প্রাক্তন সিনিয়র রেসিডেন্ট তথা বাংলায় মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ‘থ্রেট কালচার’ বা ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান হোতা ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাসকে। শুক্রবার নবান্ন ও স্বাস্থ্য ভবনের তরফে জারি করা এক কড়া বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিরূপাক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত ধরণের অসৎ আচরণ, ফৌজদারি মামলা, একাধিক এফআইআর (FIR) এবং অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো (ACB)-র তদন্ত রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর অপরাধের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। যার জেরেই এই চরম সিদ্ধান্ত নিল শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
স্বাস্থ্য দফতরের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে দু’হাত তুলে স্বাগত জানিয়েছেন আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের অভিভাবক রত্না দেবনাথ সহ গোটা রাজ্যের চিকিৎসা মহল। অন্যদিকে, চাকরি বাতিলের খবর পেয়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও ড্যামেজ কন্ট্রোলমূলক প্রতিক্রিয়া দিয়ে ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাস বলেন, “সরকারি নির্দেশ মেনে চলা একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমার কর্তব্য। আমি ১ বছর ৯ মাস সিনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছি। এর বেশি এই মুহূর্তে আমার কিছু বলার নেই।”
২০ লক্ষ টাকা জরিমানা ও সরকারি চাকরিতে আজীবন নিষেধাজ্ঞা:
স্বাস্থ্য ভবন থেকে প্রকাশিত গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে সমস্ত শাস্তিমূলক পদক্ষেপের উল্লেখ করা হয়েছে, তা নজিরবিহীন:
-
স্থায়ী বরখাস্ত: পূর্বতন সরকারের আমল থেকেই (২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর) তিনি সাসপেন্ড বা সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। এবার তাঁর সিনিয়র রেসিডেন্সির মেয়াদ সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে বাতিল (Terminate) করা হলো।
-
২০ লক্ষ টাকা জরিমানা: সরকারি ইনডেমনিটি বন্ডের (Indemnity Bond) শর্ত লঙ্ঘন করার অপরাধে তাঁকে আগামী ২ বছরের জন্য মোট ২০ লক্ষ টাকা রাজকোষে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
আজীবন নিষেধাজ্ঞা: ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সরকারি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বা হাসপাতালে বিরূপাক্ষ বিশ্বাস আর কোনও দিন সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন না, তাঁর ওপর আজীবন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
-
লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া: বিরূপাক্ষের চিকিৎসা করার সরকারি রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স যাতে চিরতরে বাতিল করা হয়, তার জন্য ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল’ (WBMC)-কে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।
“নতুন পশ্চিমবঙ্গে থ্রেট কালচারের জায়গা নেই”, বার্তা ইন্দ্রনীল খাঁর:
মেডিক্যাল কলেজগুলোতে বছরের পর বছর ধরে চলা জুনিয়র ডাক্তার ও পড়ুয়াদের ওপর মানসিক নির্যাতন, নম্বর কমিয়ে দেওয়ার হুমকি এবং বদলি সিন্ডিকেটের অবসান ঘটাতেই এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এই বিষয়ে বিজেপি বিধায়ক তথা চিকিৎসক নেতা ডা. ইন্দ্রনীল খাঁ স্বাস্থ্য দফতরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন:
“আমাদের নতুন পশ্চিমবঙ্গে কোনও রকম ‘থ্রেট কালচার’ বা ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতির জায়গা নেই। রাজ্যের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যে সিন্ডিকেটরাজ এবং দালালরাজ জাঁকিয়ে বসেছিল, তার বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘জিরো টলারেন্স’ (Zero Tolerance) নীতি নিয়েছেন। ডা. বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই প্রমাণ করে যে, অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, নতুন সরকারের হাত থেকে পার পাবে না। ডাক্তার ও রোগীদের জন্য এক সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য।”
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, আর জি কর কাণ্ডের ডায়েরি ও ফাইল পুনর্মূল্যায়ন শুরু হতেই যেভাবে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের একাধিক ‘প্রভাবশালী’ থ্রেট সিন্ডিকেটের মাথার নাম সামনে আসছে, তাতে বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের এই পতন কেবল শুরু মাত্র। আগামী দিনে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত আরও বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট চিকিৎসকের নবান্ন থেকে সোজা প্রেসিডেন্সি জেলের দিকে যাত্রা নিশ্চিত হতে চলেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







