এ যেন এক রূপকথা, যা হার মানায় সমস্ত কর্পোরেট প্রতিশ্রুতির গল্পকে। একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে যেখানে চারপাশের ঝলমলে আলো আর ঝাঁ-চকচকে পরিকাঠামোর গল্প শোনানো হয়, ঠিক সেখানেই কলকাতা বিমানবন্দর সংলগ্ন উত্তর দমদমের এক চিলতে ঘরে বিগত ৫০ বছর ধরে জাঁকিয়ে বসেছিল আদিম অন্ধকার। সন্ধ্যা নামলেই কেরোসিনের ল্যাম্প আর গরমে হাতপাখাই ছিল একমাত্র ভরসা। বহু আবেদন-নিবেদন করেও মেলেনি এক ফোঁটা বিদ্যুৎ। অবশেষে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও স্থানীয় বিধায়ক সৌরভ সিকদারের যৌথ তৎপরতায় মাত্র ৭ দিনের ব্যবধানে ঘুচল সেই দীর্ঘ পাঁচ দশকের অন্ধকার। আলোর মুখ দেখল উত্তর দমদমের গ্লোব নার্সারি এলাকার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব আরতি মণ্ডলের পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উত্তর দমদম পুরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের এই গ্লোব নার্সারি এলাকা থেকেই বিমানবন্দরের রানওয়ের ঝলমলে আলো রাতে পরিষ্কার দেখা যায়। অথচ সেই আলোর শহরের ঠিক নিচেই বাস করতেন আরতি দেবী। এই তীব্র অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই একে একে বিদায় নিয়েছেন তাঁর শ্বশুর, শাশুড়ি এবং স্বামী। ল্যাম্পের টিমটিমে আলোয় পড়াশোনা করেই বড় হয়েছে তাঁর নাতনি। বিগত বাম ও তৃণমূল জমানায় সরকারি দফতর থেকে শুরু করে স্থানীয় পুরপ্রতিনিধিদের দোরে দোরে ঘুরেও কেবল জুটেছিল আশ্বাস, মেলেনি বিদ্যুতের সংযোগ। শেষ বয়সে এসে আরতি দেবী নিজেও আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন এই পরিবারের ভাগ্য সম্পূর্ণ বদলে দিল।
সৌরভের প্রতিশ্রুতি, শুভেন্দুর নির্দেশ:
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চলাকালীন প্রথমবার আরতি মণ্ডলের ঘরে যান উত্তর দমদমের তৎকালীন বিজেপি প্রার্থী তথা বর্তমান বিধায়ক সৌরভ সিকদার। মরণপণ অন্ধকারের সেই বাস্তব চিত্র দেখে তিনি আরতি দেবীকে কথা দিয়েছিলেন, জিতলে প্রথম কাজই হবে এই ঘরে আলো আনা। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কানে পৌঁছাতেই তিনি কালক্ষেপ না করে সৌরভ সিকদারকে নির্দেশ দেন অবিলম্বে সশরীরে ওই পরিবারে গিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে। মুখ্যমন্ত্রীর সেই কড়া নির্দেশের পর বিদ্যুৎ পর্ষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবেদন জমা দেওয়া হয় এবং মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে মণ্ডলের বাড়ির দেওয়ালে বসে যায় নতুন বৈদ্যুতিক মিটার।
“ভাবিনি কোনওদিন ঘরে কারেন্ট আসবে”:
পাঁচ দশকের বন্দিদশা কাটিয়ে ঘরে আলো ও পাখা চলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন আরতি দেবী। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে এ যেন এক পরম প্রাপ্তি। চোখের কোণে জল নিয়ে আরতি মণ্ডল বলেন:
“আমি কত বছর ধরে যে সিইএসসি (CESC) আর কত নেতার দরজায় ঘুরেছি, তার কোনও হিসেব নেই। সারা জীবন পরের বাড়িতে কাজ করে চরম কষ্টে সংসার চালিয়েছি। আমার স্বামী জীবনে একটু আলো বা পাখার হাওয়া না পেয়েই ধুঁকে ধুঁকে মারা গেলেন। কোনওদিন ভাবিনি মরার আগে এই ঘরে কারেন্ট দেখতে পাব। আজ আমাদের ঘরে ভগবান হয়ে এসেছেন শুভেন্দুবাবু আর সৌরভবাবু। আমি ভাষায় আনন্দ প্রকাশ করতে পারছি না।”
বিধায়ক সৌরভ সিকদার এই বিষয়ে বলেন, “নির্বাচনী ইস্তাহারে আমাদের স্লোগানই ছিল ‘অন্ত্যোদয়’— অর্থাৎ সমাজের শেষ সারির মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয়ের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, পূর্বতন সরকারের আমলের ফাইলবন্দি বা থমকে থাকা মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলি যেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করা হয়। আমরা সেটাই করেছি।” রাজনৈতিক মহলের মতে, পাঁচ দশক ধরে ঝুলে থাকা একটি সাধারণ পরিবারের এই বিদ্যুৎ সমস্যার মাত্র সাত দিনে সমাধান করে দেওয়া নতুন বিজেপি সরকারের প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও কর্মতৎপরতার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করল।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







