বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব কি এবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে? পুজো বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে জোর জল্পনা। যদিও সরাসরি পুজো বন্ধ হওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে কমিটি নিয়ে তীব্র সংঘাত এবং আইনি জটিলতায় কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। আর এখন গোটা বিষয়টির বল গড়িয়েছে কলকাতা হাই কোর্টের কোর্টে।
কলকাতার ১০৮ বছরের প্রাচীন বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে টানাপোড়েন। সেই সংঘাতের জল গড়ায় আদালত পর্যন্ত। কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে গত রবিবার সাধারণ সম্পাদক এবং চারজন সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোটাভুটি হয়। আদালত নিযুক্ত দুই পর্যবেক্ষকের নজরদারিতেই সম্পন্ন হয় সেই নির্বাচন।
মোট ভোটার ছিলেন ৭৭ জন। তাঁদের মধ্যে ভোট দেন ৬৬ জন। কিন্তু সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীই পান ৩৩টি করে ভোট। ফলে সমান সমান ভোটে আটকে যায় ফলাফল। সাধারণ সম্পাদক কে হবেন, তা নিয়ে তৈরি হয় নতুন জটিলতা।
এর মধ্যেই আদালত নিযুক্ত পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন প্রার্থী গৌতম নিয়োগী। তাঁর অভিযোগ, পর্যবেক্ষক পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছেন। ভোটের দিন অশান্তির অভিযোগও সামনে আসে। এক মহিলার তরফে ভোটের দিন গোলমালের অভিযোগ করা হয়েছে।
ফলে একদিকে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জট, অন্যদিকে পর্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং ভোটের দিনের অশান্তি—সব মিলিয়ে বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
তবে এই পুজোর ইতিহাস কিন্তু শুধু ১০৮ বছরের নয়, কলকাতার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
১৯১৯ সালে ৫৫, বাগবাজার স্ট্রিটে ‘নেবুবাগান বারোয়ারি দুর্গাপূজা’ নামে এই পুজোর সূচনা। পরে পশুপতি বোস লেন এবং বাগবাজার কালীমন্দির সংলগ্ন এলাকায় পুজো অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বাগবাজারে শুরু হয় এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসব।
সমাজকর্মী নগেন্দ্রনাথ ঘোষালের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে পুজো কমিটি। পরে ‘বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব’ নামে পরিচিতি পায় এই সংগঠন। ১৯৩০ সালে দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সভাপতি হন। সেই বছরই পুজোয় স্বদেশি সামগ্রীর প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছিল।
আর ইতিহাসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—১৯৩৮-৩৯ সালে এই পুজো কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও এই পুজোর ইতিহাসের যোগ রয়েছে। বিপ্লবী চিত্তরঞ্জন দাস স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
তাই এই পুজোকে ঘিরে বর্তমান কমিটির অচলাবস্থা শুধু একটি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার দীর্ঘ ঐতিহ্য ও ইতিহাসও।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সমান ভোটের জট কীভাবে কাটবে? কমিটির নেতৃত্বে কে আসবেন? আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন, আদালতের পরবর্তী নির্দেশে কি খুলবে এই ১০৮ বছরের পুজোর জট?
বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব বন্ধ হবে কি না, তার উত্তর এখন আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







