কলকাতা, ১৭ জুলাই ২০২৬: পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলির মিড ডে মিল (Mid-Day Meal) প্রকল্পের পরিচালন ব্যবস্থা নিয়ে এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। কলকাতা পুরসভা এলাকার পর এবার গোটা নদীয়া জেলা এবং পর্যায়ক্রমে সমগ্র রাজ্য জুড়েই মিড ডে মিলের রান্না ও তা সরবরাহের ভার তুলে দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ‘ইসকন’ (ISKCON)-এর হাতে। বৃহস্পতিবার কলকাতার অ্যালবার্ট রোডে ইসকনের রথযাত্রা উৎসবের মঞ্চে দাঁড়িয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারের এই নতুন রূপরেখার কথা ঘোষণা করেন। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই মিড ডে মিলের খাদ্যতালিকায় ‘ডিম’ বা প্রাণীজ প্রোটিন বাদ যাওয়া নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
“শিশুদের খাবার নিয়ে অনিয়ম পাপের সমান”: পূর্বতন তৃণমূলকে নিশানা শুভেন্দুর
রথযাত্রার পুণ্য লগ্নে ইসকনের সামাজিক কাজের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিগত সরকারের জমানার একাধিক দুর্নীতির ইতিহাস টেনে আনেন।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান বক্তব্যসমূহ:
-
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা: মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে মিড ডে মিল নিয়ে যেভাবে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। শিশুদের মুখের খাবার নিয়ে যারা অনিয়ম বা চুরি করে, তাদের এই কাজ মহাপাপের সমান।”
-
পবিত্র ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ: তিনি দাবি করেন, ইসকনের মতো আধ্যাত্মিক ও জনকল্যাণমূলক সংস্থার হাতে এই দায়িত্ব অর্পণ করার ফলে একদিকে যেমন দুর্নীতি বন্ধ হবে, অন্যদিকে তেমনই ছাত্রছাত্রীরা সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি অত্যন্ত উন্নতমানের পুষ্টিকর খাবার পাবে।
-
গরিব শিশুদের অপুষ্টি দূরীকরণ: মুখ্যমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, সরকারি স্কুলে যে সমস্ত ছেলেমেয়েরা মিড ডে মিলের ওপর নির্ভরশীল, তারা মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তান। তাই তাদের অপুষ্টি দূর করতে পুষ্টিকর আহার পৌঁছে দেওয়া বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাশ্রমকেও পাশে চায় সরকার
বাংলার সামাজিক ও পরিকাঠামোগত পুনর্নির্মাণে শুধুমাত্র সরকারি আধিকারিকদের ওপর ভরসা না রেখে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সরাসরি প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে চায় নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী এদিন জানান, “আমরা কেবল ইসকন নয়, আগামী দিনে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো মানুষের সেবায় নিয়োজিত সমস্ত শ্রদ্ধেয় সংস্থাকে সঙ্গে নিয়েই বাংলার নবনির্মাণের পথে এগোতে চাই।”
ডিম-বিতর্ক: মেনু নিয়ে সুর চড়াচ্ছে বিরোধীরা
মুখ্যমন্ত্রীর এই জনকল্যাণমূলক ঘোষণার পরেই মিড ডে মিলের ‘মেনু’ বা খাদ্যতালিকা নিয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে বিতর্ক। বিরোধীদের মূল আপত্তির জায়গাগুলি নিচে দেওয়া হলো:
-
প্রাণীজ প্রোটিন বর্জন: ইসকনের রান্নাঘরে সম্পূর্ণ নিরামিষ (সাত্ত্বিক) খাবার তৈরি করা হয়, যেখানে পেঁয়াজ-রসুন তো দূরস্ত, মাছ, মাংস বা ডিমের মতো কোনও প্রাণীজ প্রোটিন ছোঁয়াও নিষিদ্ধ।
-
পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা: বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির দাবি, গরিব ঘরের বাড়ন্ত শিশুদের শরীরে প্রোটিনের জোগান দিতে সপ্তাহে অন্তত দু’দিন মিড ডে মিলে ডিম দেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। ইসকনকে দায়িত্ব দেওয়ার ফলে তালিকা থেকে ডিম পুরোপুরি বাদ চলে যাবে, যা শিশুদের সামগ্রিক পুষ্টির পক্ষে অন্তরায় হতে পারে।
-
খাদ্যাভ্যাসের ওপর হস্তক্ষেপ: সমালোচকদের একাংশের মতে, বাংলার সিংহভাগ সাধারণ মানুষের খাদ্যাভাস আমিষ প্রধান। জোর করে নিরামিষ মেনু চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত।
এই তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোরের মাঝেও নবান্ন কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। প্রশাসনিক মহলের মতে, দুর্নীতির চাদরে মোড়া পুরনো মিড ডে মিল ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও আধুনিক করতে ইসকনের সেন্ট্রালাইজড কিচেন বা আধুনিক রান্নাঘর প্রযুক্তিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







