পুরী, ১৭ জুলাই ২০২৬: কড়া নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সত্ত্বেও রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে বড়সড় দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল ওড়িশার শ্রীক্ষেত্র পুরী। গতকাল, বৃহস্পতিবার জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার উৎসব চলাকালীন বড়দণ্ড (Grand Road) এলাকায় আচমকা ভিড়ের চাপে তীব্র হুড়োহুড়ি ও পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা এবং হুড়োহুড়ির জেরে অসুস্থ হয়ে পড়া অন্তত দু’জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ভিড়ের চাপে এবং শ্বাসকষ্টের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রায় শতাধিক পুণ্যার্থীকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলভদ্র ও দেবী সুভদ্রাকে মন্দির থেকে রথে তোলার ‘পাহণ্ডি’ প্রথা দেখার জন্য গতকাল সকাল থেকেই বড়দণ্ড এবং সিংহদ্বারের সামনে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়েছিল।
কীভাবে ঘটল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা?
প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গতকাল দুপুরে যখন তিনটি রথের রশি টানার প্রস্তুতি শুরু হয়, ঠিক সেই সময়ই মরিচীকোট চকের কাছে মূল ভিড়ের মাঝখান দিয়ে একটি জরুরি অ্যাম্বুল্যান্স পার করার চেষ্টা করছিল পুলিশ।
দুর্ঘটনার মুহূর্তের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
-
অ্যাম্বুল্যান্সের রাস্তা ছাড়ার তাড়াহুড়ো: বিশাল জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সটিকে রাস্তা করে দিতে পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীরা একদিকের ভিড়কে সজোরে ঠেলতে শুরু করেন।
-
ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান ভক্তরা: এর ফলেই তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। ভিড়ের তীব্র চাপে একে অপরের গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়তে শুরু করেন পুণ্যার্থীরা। তীব্র গরম এবং চূড়ান্ত আর্দ্রতার মধ্যে পরিস্থিতি নিমেষেই হাতের বাইরে চলে যায়।
-
দমবন্ধ হওয়া পরিস্থিতি: মাটিতে পড়ে যাওয়া বহু পুণ্যার্থী ভিড়ের পায়ের তলায় পিষে যান। দমবন্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই সংজ্ঞা হারান অনেকে।
মৃতদের পরিচয় এবং হাসপাতালের তৎপরতা
এই অনভিপ্রেত দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিচয় জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন কটকের বাসিন্দা অনিল দাস (৩৬) এবং অন্যজন মহারাষ্ট্র থেকে বন্ধুদের সঙ্গে রথযাত্রা দেখতে আসা অশোক রাইকার (৬০)। হাসপাতাল সূত্রে খবর, অনিলের মৃত্যু হয়েছে পাঁজরের হাড় ভেঙে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় (chest compression), অন্যদিকে অশোকবাবুর মাথায় গুরুতর চোট লেগেছিল।
উদ্ধারকাজের প্রধান প্রধান আপডেট:
-
দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর উদ্ধার: ওড়িশা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ রেসকিউ টিম (SRU) যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ভিড়ের মাঝখান থেকে অন্তত ১০০ জন পুণ্যার্থীকে উদ্ধার করে এবং তাঁদের অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়।
-
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেকেই: গুরুতর জখম পুণ্যার্থীদের প্রথমে পুরী জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় পরে তাঁদের কটকের এসসিবি (SCB) মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও প্রশাসনের সাফাই
এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওড়িশার বর্তমান নবগঠিত বিজেপির মোহন চরণ মাঝি সরকারের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে বিরোধী দল বিজু জনতা দল (BJD) এবং কংগ্রেস। বিরোধীদের দাবি, গত বছরের রথযাত্রাতেও তিনজনের মৃত্যুর ঘটনার পর থেকে প্রশাসনের কোনও শিক্ষা হয়নি।
যদিও ওড়িশার স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা দাবি করেছেন, পুরীতে কোনও সামগ্রিক ‘পদপিষ্ট’ (systemic stampede) হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ভিড় অত্যন্ত বেশি থাকায় এবং সঙ্গে অনবরত বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়া থাকার কারণে মূলত হিট-স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এবং শ্বাসকষ্টজনিত কারণেই এক প্রবীণ পুণ্যার্থী মারা যান। এছাড়া অন্যজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শুক্রবারও রথযাত্রার পরবর্তী ধর্মীয় আচারগুলি নির্বিঘ্নে পালিত হচ্ছে।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







