মিনাখাঁ (উত্তর ২৪ পরগনা), ১৬ জুলাই ২০২৬: বিধানসভা নির্বাচনের পর ক্ষমতা হারিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালীঘাট তৃণমূল’ বনাম ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরের অন্তহীন কাজিয়া যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নিচুতলার রাজনীতিতে এক নিঃশব্দ সমীকরণ বদল শুরু হয়েছে। দলের শীর্ষ স্তরের হেভিওয়েট নেতারা যখন ‘সুখের পালঙ্ক’ বা ‘খাটিয়া’র খোঁজে আইনি ও রাজনৈতিক দড়িটানাটানি করছেন, তখন নিচুতলার সাধারণ কর্মীরা কিন্তু ঘাসফুল শিবিরের অভ্যন্তরীণ কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
তৃণমূলের এই চরম দুর্দিন ও পারস্পরিক গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে এবার উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁয় নিজেদের ঘর গুছিয়ে নিল সিপিআই(এম)। এক লপ্তে শতাধিক সক্রিয় তৃণমূল কর্মী-সমর্থক ঘাসফুল ছেড়ে যোগ দিলেন বামফ্রেন্টে, যা এই মুহূর্তে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
মিনাখাঁর ঝুজুরগাছায় তৃণমূলের বড় ভাঙন
বুধবার উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁ বিধানসভার অন্তর্গত সোনাপুকুর-শংকরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ঝুজুরগাছা এলাকায় সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ কর্মীসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেই প্রকাশ্য জনসভাতেই মিনাখাঁর স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে লাল পতাকা হাতে তুলে নেন শ’খানেক পরিবার।
দলত্যাগীদের মূল অভিযোগ ও যোগদানের প্রেক্ষাপট:
-
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ: সদ্য সিপিএমে যোগ দেওয়া কর্মীদের দাবি, বিগত বছরগুলিতে পঞ্চায়েত এলাকা জুড়ে তৃণমূলের একাংশ যে লাগামছাড়া দুর্নীতি করেছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে মুখ দেখানোর অযোগ্য করে তুলেছে। বর্তমানের দলীয় বিভাজন তাঁদের মোহভঙ্গ আরও ত্বরান্বিত করেছে।
-
সম্মানের খোঁজে দলবদল: তৃণমূল ত্যাগী সাধারণ কর্মী মণিরুল মোল্লা ক্ষোভের সুরে জানান, “তৃণমূলের অন্দরে এখন কার কথা কে শুনবে, তার কোনও ঠিক নেই। একটা দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। এখন সিপিএমে এসে খুব ভালো লাগছে, দীর্ঘদিন পর দলে এসে এতটা সম্মান পেলাম।”
“তৃণমূল দলটাই তো আর নেই, মানুষ আশ্রয় খুঁজছে”: রাজু আহমেদ
মিনাখাঁ এলাকায় তৃণমূলের এই ভাঙনকে হাতিয়ার করে আগামী দিনে সুন্দরবন লাগোয়া এই অঞ্চলে সংগঠনের ভীত আরও মজবুত করা যাবে বলে আশাবাদী স্থানীয় বাম নেতৃত্ব।
যোগদান মঞ্চ থেকে এলাকার প্রভাবশালী সিপিএম নেতা রাজু আহমেদ বলেন:
“এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো আদতে আমাদের সঙ্গেই ছিলেন, আমাদের লাল পতাকারই লোক। কিন্তু বিগত জমানার তীব্র পুলিশি অত্যাচার, মিথ্যা মামলা আর ভয়ের কারণে বাধ্য হয়ে নিজেদের বাঁচাতে ঘাসফুলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। আজ বাংলায় তৃণমূল বলে আস্ত কোনও দলই আর বেঁচে নেই, ওটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গিয়েছে। স্বভাবতই নিচুতলার বিভ্রান্ত ও অত্যাচারিত মানুষগুলো বাঁচার জন্য সঠিক রাস্তা খুঁজছেন। আর এই দুঃসময়ে মেহনতি মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত আশ্রয় হলো এই লাল পতাকা।”
কোথাও কৃষক সভা, কোথাও যুব— জেলা জুড়ে বাড়ছে ভিড়
সিপিএম জেলা নেতৃত্বের দাবি, মিনাখাঁর এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দল ভাঙার এই মরশুমে প্রতিদিন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ এবং মাঠের কর্মীরা বামেদের বিভিন্ন শাখা সংগঠনে নাম লেখাচ্ছেন। কোথাও সারা ভারত কৃষক সভা, কোথাও সিআইটিইউ (CITU), আবার কোথাও ডিওয়াইএফআই (DYFI)-এর মতো ছাত্র-যুব সংগঠনে স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান চলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসক শিবিরের শীর্ষ স্তরের এই ভাঙন ও মামলার লড়াই যত দীর্ঘায়িত হবে, গ্রামীণ বাংলার বামপন্থী ভোটব্যাঙ্ক তত দ্রুত নিজেদের পুরনো ঘরে ফিরতে শুরু করবে, যার প্রথম ঝলক দেখা গেল মিনাখাঁর এই সোনাপুকুর-শংকরপুর পঞ্চায়েতে।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







