কলকাতা, ১৬ জুলাই ২০২৬: রাজনীতিতে তাঁর মতো বৈচিত্র্যময় ও রঙিন চরিত্র আর দ্বিতীয়টি নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা ‘কালারফুল বয়’, ১৯৯৮ সালে তৃণমূল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যিনি ছিলেন নেত্রীর ছায়াসঙ্গী, সেই কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র শেষপর্যন্ত সব সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে যোগ দিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরে। বুধবার সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিধানসভায় গিয়ে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতর পাশে বসেন তিনি। আর দলবদল করতেই মদন মিত্রকে নিজেদের শিবিরের ‘রোনাল্ডিনহো’ বলে স্বাগত জানান ঋত-পন্থীরা।
পারিবারিক সূত্রে কেন্দ্রীয় এজেন্সির চাপ এবং কালীঘাটের ‘শীতল’ মনোভাবই যে এই ঐতিহাসিক দলবদলের নেপথ্য কারণ, তা এদিন অকপটে স্বীকার করেছেন মদন মিত্র। তাঁর এই দলত্যাগের ফলে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর কার্যত আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
“লাগেজ-ব্যাগেজ থাকলে মুশকিল”— দিদির একটা কথাতেই ভাঙল মন!
শিবির বদলের আসল কারণ খোলসা করতে গিয়ে মদন মিত্র জানান, মঙ্গলবার দুপুরে তাঁর স্ত্রী ও দুই পুত্রকে সিজিও কমপ্লেক্সে তলব করে ইডি (ED)। এই খবর পাওয়ার পরপরই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মদন বাবু সরাসরি ফোন করেছিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
মদন মিত্রের দাবি:
“আমি দিদিকে ফোন করে পরিবারের ওপর এই এজেন্সির চাপের কথা জানিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম উনি পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু দিদি পাশে দাঁড়ানো তো দূরস্ত, উলটে অত্যন্ত শীতল সুরে বললেন— ‘লাগেজ, ব্যাগেজ থাকলেই মুশকিল।’ এই একটা কথাই আমার দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের মনটা ভেঙে দিল। যে দলের জন্য জীবন যৌবন সব দিলাম, বিপদের দিনে তাঁদের কাছ থেকে এই উত্তর আশা করিনি। তখনই ফোনে একটা ‘সরি’ (Sorry) মেসেজ লিখে দিদির হাত ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই।”
মঙ্গলবার রাতেই তিনি চলে যান এন্টালির প্রাক্তন বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহার তালতলার বাড়িতে। সেখানে দীর্ঘক্ষণ বৈঠকের পর বুধবার দক্ষিণেশ্বরের বাড়ি থেকে সোজা বিধানসভায় পৌঁছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেন তিনি।
“অভিষেকের সঙ্গেই তৃণমূল ধ্বংস হয়ে গিয়েছে”, তীব্র আক্রমণ মদনের
কয়েকদিন আগেও যে ঋতব্রত শিবিরের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছিলেন মদন, বুধবার সেই ঘরে পা রেখেই ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আইপ্যাকের (I-PAC) বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন।
মদন মিত্রের চাঁছাছোলা আক্রমণ:
-
ব্যক্তি সর্বস্ব দল নয়: “অভিষেক আর যাই হোক, কোনওদিন তৃণমূলের মুখ হতে পারে না। একজনের জন্য দল চলে না, দল সবার। ওই আইপ্যাক জিনিসটা খায় না মাথায় দেয়, তা আজও বোঝা গেল না। একটা অত্যন্ত জটিল ও দমবন্ধ করা ব্যাপার তৈরি করা হয়েছিল ভেতরে। অভিষেকের ঔদ্ধত্যের সঙ্গেই পুরনো তৃণমূল ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।”
-
পালঙ্ক বনাম খাটিয়া: নিজের বিধায়ক পদ নিয়ে আইনি অবস্থান স্পষ্ট করে মদন বলেন, “আমি শুধু তৃণমূলের বিধায়ক নই, আমি এই রাজ্যের বিধায়ক, বিধানসভার সদস্য। ওপারে হয়তো একটা বিলাসবহুল সুখের পালঙ্ক ছিল, আর এই ঘরে হয়তো একটা সাধারণ খাটিয়া রয়েছে। আমি খাটিয়ার দিকটাই বেছে নিলাম।”
অনুব্রতর গলাতেও একই সুর, একুশের পাল্টা প্রস্তুতি তুঙ্গে
মদন মিত্রের এই দলবদলের দিনই বীরভূমের ‘কেষ্ট’ তথা অনুব্রত মণ্ডলও বিধানসভায় ঋতব্রতর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের অফিশিয়াল কর্মসূচিতে যোগ দেন। বিকেলে তপসিয়ায় জাভেদ খানের কার্যালয়ে আয়োজিত একুশে জুলাইয়ের পাল্টা শহীদ দিবসের প্রস্তুতি বৈঠকেও মদন ও অনুব্রতকে একসঙ্গে ফ্রেম শেয়ার করতে দেখা যায়।
অনুব্রত মণ্ডলের গলাতেও এদিন অভিষেকের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবিরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ শোনা গিয়েছে। কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রের ভবিষ্যদ্বাণী— “এটা তো সবে শুরু। যে ধরনের পরিস্থিতি ওপারে তৈরি হয়েছে, তাতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরও অনেক হেভিওয়েট বিধায়ক ও সাংসদ সুখের পালঙ্ক ছেড়ে এই খাটিয়াতেই এসে বসবেন।” একুশে জুলাইয়ের আগে এই জোড়া দলবদল নিঃসন্দেহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপর সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







