ভক্তির আবেগে যাঁর নাম উচ্চারিত হয়, অমাবস্যার নিশিতে যাঁর আরাধনায় মেতে ওঠেন অগণিত মানুষ—তিনি মা তারা। হিন্দুধর্মের দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় দেবী হিসেবে পূজিতা তারামা আবার দেবী কালীরও এক বিশেষ রূপ বলে মানা হয়।
‘তারা’—অর্থাৎ যিনি সংসারের বন্ধন, বিপদ ও দুঃখ থেকে ভক্তকে ত্রাণ করেন। কালীর মতোই তাঁর রূপ ভয়ংকর, তবে তারামূর্তির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। প্রচলিত মূর্তিকল্পনায় তাঁর বাম চরণ শবরূপী মহাদেবের হৃদয়ের উপর স্থাপিত।
মা তারাকে ঘিরে রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি। কথিত আছে, মহামুনি বশিষ্ঠ দেবী তারাকে সন্তুষ্ট করতে প্রথমে সাধারণ নিয়মে তপস্যা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাতে দেবীর কৃপা লাভ না হওয়ায় তিনি চিন দেশে যান। সেখানে তান্ত্রিক সাধনার মাধ্যমে দেবী তারার আরাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেন বলে কিংবদন্তি রয়েছে।
আর একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে সমুদ্রমন্থনের সঙ্গে। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, সমুদ্রমন্থনের সময় উঠে আসে ভয়ংকর কালকূট বিষ। সেই বিষ পান করে মহাদেব নীলকণ্ঠ হন এবং বিষের তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েন। তখন দেবী তারা স্নেহময়ী মায়ের রূপ ধারণ করে শিবকে স্তন্যপান করান এবং তাঁর বিষের জ্বালা প্রশমিত করেন—এমনই বিশ্বাস ভক্তমহলে প্রচলিত।
আর দেবী তারার সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা নাম—তারাপীঠ।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠকে দেবী তারার প্রধান তীর্থক্ষেত্র হিসেবে মানেন ভক্তরা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সতীর নয়ন বা ‘তারা’ এখানে পতিত হয়েছিল। সেই বিশ্বাস থেকেই এই পীঠের সঙ্গে দেবী তারার আরাধনার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
তারাপীঠ শুধু শক্তিসাধনার অন্যতম কেন্দ্র নয়, এটি সাধক বামাক্ষ্যাপার নামের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মা তারার পরম ভক্ত ও সাধক হিসেবে বামাক্ষ্যাপার জীবন ও সাধনাকে ঘিরে আজও অসংখ্য কাহিনি ও লোকবিশ্বাস প্রচলিত।
ভয়ংকরী রূপে শক্তি, আবার ভক্তের কাছে স্নেহময়ী মা—এই দুই বৈপরীত্যের অপূর্ব সমন্বয়েই ‘তারামা’।
তাই তাঁর আরাধনা শুধু দেবীর কাছে প্রার্থনা নয়, ভক্তের বিশ্বাসে এটি যেন বিপদ থেকে মুক্তি, অন্ধকার থেকে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার এক আধ্যাত্মিক আশ্রয়।
রূপে তিনি শক্তির প্রতীক, স্বরূপে তিনি মমতাময়ী জননী—এই বিশ্বাসেই যুগ যুগ ধরে ভক্তের হৃদয়ে বিরাজ করছেন মা তারা।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







