best news portal development company in india

ক্রিকেট ইতিহাসের এক মহাজাতকের অবসান: ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত স্যার গারফিল্ড সোবার্স, শোকস্তব্ধ বিশ্ব ক্রীড়ামহল

SHARE:

ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার স্যার গারফিল্ড সোবার্স (Sir Garfield Sobers) আর নেই। শুক্রবার ৮৯ বছর বয়সে পরলোকে গমন করলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের এই প্রবাদপ্রতিম নক্ষত্র। কাকতালীয়ভাবে, ঠিক দুই সপ্তাহ পরেই তাঁর ৯০তম জন্মদিন পালনের কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ক্রিকেট ঈশ্বরকে বিদায় জানিয়ে অমৃতলোকে পাড়ি দিলেন তিনি। যাঁর নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিংবদন্তি ৩৬৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস কিংবা এক ওভারে ছয় বলে ছয় ছক্কার সেই অবিশ্বাস্য কীর্তি, তাঁর প্রয়াণে আজ গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা বিশ্ব ক্রিকেট মহলে।

একাই ছিলেন একশো: ক্রিকেটের ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’

স্যার গ্যারির মতো বহুমুখী প্রতিভা ক্রিকেট বিশ্ব খুব কমই দেখেছে। তিনি কেবল একজন বিধ্বংসী বাঁহাতি ব্যাটারই ছিলেন না, বল হাতেও তিনি ছিলেন এক জাদুকর। একই ম্যাচে তিনি যেমন বাঁহাতি প্রথাগত স্পিন করতে পারতেন, তেমনই পরিস্থিতি অনুযায়ী অনায়াসে করতে পারতেন চায়নাম্যান কিংবা নিখুঁত মিডিয়াম পেস বোলিং।

তাঁর প্রাথমিক জীবন ও কেরিয়ারের সূচনা:

  • ১৬ বছর বয়সে অভিষেক: মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্বাডোজের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তাঁর।

  • জাতীয় দলে প্রবেশ: প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার ঠিক দু’বছর পরেই, ১৯৫৪ সালে তাঁর জন্য খুলে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের দরজা।

  • ২০ বছরের বর্ণময় কেরিয়ার: ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪— দীর্ঘ ২০ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে তিনি ক্যারিবিয়ান দেশকে যেমন অসংখ্য ম্যাচ জিতিয়েছেন, তেমনই বিশ্ব ক্রিকেটের ব্যাকরণকে সমৃদ্ধ করেছেন নতুন নতুন রেকর্ডে।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ৩৬৫ রানের সেই মহাকাব্য ও লারার ভাঙন

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্যার গ্যারির উত্থান ছিল রাজকীয়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিটি পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তরুণ সোবার্স সেদিন শুধু সেঞ্চুরিতেই থামেননি; সেই ইনিংসকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন ৩৬৫ রানের এক অপরাজিত মহাকাব্যিক স্কোরে।

বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে এই ইনিংসটির গুরুত্ব অপরিসীম:

  • ৩৬ বছরের রেকর্ড: টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের এই বিশ্বরেকর্ড দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে অক্ষুণ্ন ছিল।

  • লারা-বন্দনা: পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩৭৫ রান করে সোবার্সের এই রেকর্ড ভাঙেন আরেক ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা। তবে লারার রেকর্ড এলেও স্যার গ্যারির সেই ঐতিহাসিক ইনিংস ক্রিকেট রোমান্টিকদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

রেকর্ড ও কীর্তির খতিয়ান: টাই টেস্ট থেকে ম্যারাথন স্পেল

নিজের কেরিয়ারে পাঁচটি পৃথক টেস্ট সিরিজে ৫০০-র বেশি রান করার বিরল নজির গড়েছিলেন সোবার্স। ১৯৫৮-৫৯ মরসুমে ভারতের মাটিতে এসে একাই তিনটি দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। এরপর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ফ্র্যাঙ্ক ওরেলের সঙ্গে জুটি বেঁধে ৩৯৯ রানের এক ম্যারাথন পার্টনারশিপ গড়েন, যার জন্য তাঁদের ক্রিজে কাটাতে হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৯ ঘণ্টা।

তাঁর কেরিয়ারের আরও কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত:

  • ইতিহাসের প্রথম টাই টেস্ট: ১৯৬০ সালে ব্রিসবেনে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ‘টাই’ হওয়া টেস্ট ম্যাচেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ১৩২ রানের এক অনবদ্য ইনিংস খেলেছিলেন সোবার্স।

  • টানা ২২ ওভারের স্পেল: ১৯৬৮-৬৯ মরসুমে ব্রিসবেন টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ওপেনিং বোলার হিসেবে নেমে টানা ২২টি (সে আমলের ৮ বলের ওভার) ওভার বল করে ৭৩ রানে ৬ উইকেট নেওয়ার অবিশ্বাস্য নজির গড়েন তিনি।

পরিসংখ্যানের আয়নায় স্যার গ্যারি: ক্যালিসের পাশে অনন্য সিংহাসন

নিজের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে মোট ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুর যুগে ১টি ওয়ান ডে ম্যাচ খেলেছিলেন সোবার্স। টেস্ট ক্রিকেটে ৫৭.৭৮ গড়ে ৮,০৩২ রান করার পাশাপাশি বল হাতে শিকার করেছেন ২৩৫টি উইকেট

ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার:

টেস্ট ক্রিকেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে ৮০০০-এর বেশি রান এবং ২০০-র বেশি উইকেট নেওয়ার এই অতিমানবীয় ও বিরল কৃতিত্ব রয়েছে পৃথিবীর মাত্র দুজন ক্রিকেটারের ঝুলিতে। একজন হলেন স্যার গ্যারি সোবার্স এবং অপরজন দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিস।

স্যার গ্যারির প্রয়াণের খবর সামনে আসতেই ভিভ রিচার্ডস, শচীন তেন্ডুলকর, ব্রায়ান লারা থেকে শুরু করে বর্তমান যুগের সমস্ত ক্রিকেটার ও আইসিসি গভীর শোকপ্রকাশ করেছে। ক্রিকেট মাঠের সেই চুইংগাম চিবানো ও কলার খাড়া করে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে যাওয়া চিরকালের মতো থেমে গেল ঠিকই, কিন্তু আধুনিক ক্রিকেট যতদিন বাঁচবে, স্যার গারফিল্ড সোবার্স অলরাউন্ডারদের শেষ কথা হিসেবে ক্রিকেট ইতিহাসে অমর থাকবেন।

Supravat Bangla
Author: Supravat Bangla

PRGI Approved - WBBEN/25/A1519

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *