কলকাতা, ২০ জুলাই ২০২৬: প্রতি বছর ২১ জুলাই বলতেই যে ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউস বা কলকাতার নির্দিষ্ট কোনো মেগা সভার কথা মনে পড়ত, ২০২৬ সালের রাজনীতিতে তা সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অলিন্দে কালীঘাট বনাম ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আসল তৃণমূল’-এর তীব্র লড়াইয়ের মাঝেই এবার একুশে জুলাইয়ের মঞ্চকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন এক রাজনৈতিক ত্রিভুজ। আগামীকাল সোমবার তিলোত্তমায় মোট তিনটি আলাদা জায়গায় পালিত হতে চলেছে ১৯৯৩ সালের মহাকরণ অভিযানের রক্তক্ষয়ী স্মৃতিতে তৈরি ‘শহীদ দিবস’।
তবে সমস্ত জল্পনাকে উস্কে দিয়ে সবচেয়ে বড় চমক তৈরি করেছে প্রদেশ কংগ্রেস! শহীদ মিনারে জাতীয় কংগ্রেসের শহীদ মঞ্চের মূল ব্যানার ও ফ্লেক্সে স্থান পেতে চলেছে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। এই নিয়েই এখন রাজ্য রাজনীতিতে তুঙ্গে চর্চা।
একুশে জুলাই ২০২৬: শহরজুড়ে তিন প্রান্তের তিন সভা
রাজনৈতিক মানচিত্রে ক্ষমতা বদল ও ঘাসফুল শিবিরের অভূতপূর্ব ভাঙনের পর এবার একুশে জুলাই পালন হতে চলেছে ভিন্ন তিন মঞ্চে:
-
বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘কালীঘাট তৃণমূল’ তাঁদের শহীদ সমাবেশের আয়োজন করেছে।
-
গান্ধী মূর্তির পাদদেশে: বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী ‘ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল’ পৃথকভাবে শহীদ দিবস পালন করবে। ঋতব্রত শিবির ইতিমধ্যেই পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তাঁদের মঞ্চে বা ব্যানারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো ছবি থাকবে না।
-
শহীদ মিনারে: প্রদেশ কংগ্রেসের মূল শহীদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী শহীদ মিনার ময়দানে।
বর্তমান সময়ের নয়, স্থান পাচ্ছে ‘১৯৯৩-এর আন্দোলনের মমতা’
ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল যেখানে মমতার ছবি বর্জন করেছে, সেখানে একদা তৃণমূলনেত্রীর পুরনো দল কংগ্রেসের মঞ্চে ওঁর ছবি স্থান পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই কারণ ব্যাখ্যা করেছেন প্রদেশ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব।
কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রধান যুক্তি ও বক্তব্য:
-
ইতিহাসকে অস্বীকার নয়: প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার এবং রাজ্য পর্যবেক্ষক প্রকাশ জোশী জানিয়েছেন, শহীদ মিনারের মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান সময়ের কোনো ছবি থাকছে না। সেখানে থাকবে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানের সময় তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতার রাজপথে লড়াই এবং রক্তঝরা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছবি।
-
আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ: কংগ্রেস নেতৃত্বের মতে, ১৯৯৩-এর ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক মহাকরণ অভিযানটি ছিল জাতীয় যুব কংগ্রেসের পতাকাতলে। তৎকালীন যুবনেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা দূরত্ব থাকলেও ইতিহাসকে কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
মণীশ গুপ্তকে কাঠগড়ায় তুলে দুই দিকেই তোপ
ছবি রাখা নিয়ে রাজনৈতিক সৌজন্য দেখালেও তৎকালীন বাম সরকারের ভূমিকা এবং পরবর্তীকালে তৃণমূলের রাজনৈতিক চালের তীব্র সমালোচনা করতে ছাড়েনি কংগ্রেস।
-
তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিবকে তোপ: ১৯৯৩ সালের সেই দিনটিতে যুবক-যুবতীদের ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনায় তৎকালীন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব মণীশ গুপ্তকে সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস।
-
তৃণমূলকে বিঁধে আক্রমণ: কংগ্রেস নেতারা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যে মণীশ গুপ্তের নির্দেশে ২১ জুলাই ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই মণীশ গুপ্তকেই নিজের দল তৃণমূলে এনে রাজ্য মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছিলেন।
প্রস্তুত শহীদ মিনারের মঞ্চ
রবিবার শহীদ মিনারে সভার চূড়ান্ত প্রস্তুতি খতিয়ে দেখেন প্রদেশ কংগ্রেসের রাজ্য পর্যবেক্ষক প্রকাশ জোশী, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, অমিতাভ চক্রবর্তী এবং আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়ের মতো শীর্ষ নেতারা।
এবারের কংগ্রেসের মঞ্চটি মূলত দুটি ভাগে তৈরি করা হচ্ছে:
-
মূল মঞ্চ: রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের পাশাপাশি বিশেষ মর্যাদা দিয়ে বসানো হবে ১৯৯৩-এর ২১ জুলাই শহিদ হওয়া ১৩ জন পরিবারের সদস্যদের।
-
সহকারী মঞ্চ: সেখানে থাকবেন প্রদেশ কংগ্রেসের জেলা ও ব্লক স্তরের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব।
কালীঘাট ও ঋতব্রত শিবিরের পারস্পরিক তোপ দাগার মাঝেই কংগ্রেসের এই ‘ঐতিহাসিক সত্য’কে সামনে রেখে মমতার ছবি ব্যবহার করার সিদ্ধান্তকে এক নতুন রাজনৈতিক রসায়ন বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







