ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ভরাডুবির পর থেকে রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, তা থামার কোনও লক্ষণই নেই। উল্টে ২১ জুলাইয়ের শহীদ দিবসের সমাবেশের ঠিক মুখে এসে সেই ভাঙন যেন সুনামির আকার ধারণ করেছে। রাজ্যসভা থেকে তৃণমূলের প্রথম সারির একাধিক সাংসদের ইস্তফার পর এবার খোদ প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী তথা বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ব্রাত্য বসুকে নিয়ে জোরদার জল্পনা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। শোনা যাচ্ছে, কালীঘাটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনিও এবার বিধানসভার নবনিযুক্ত বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিতে পারেন।
নির্বাচনে হারের পর থেকেই সম্পূর্ণ অন্তরালে চলে গিয়েছেন দমদমের বিদায়ী বিধায়ক ব্রাত্য বসু। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা সাম্প্রতিক কোনও সাংগঠনিক বৈঠকেই তাঁকে দেখা যায়নি। যদিও এই দলবদল এবং ‘ঋতব্রত তৃণমূলে’ নাম লেখানোর বিষয়ে ব্রাত্য বসুর তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দেওয়া হয়নি।
কোয়েলের ইস্তফা ও ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে সাক্ষাৎ
গত জুন মাসের প্রথম দিকে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইক দল ছেড়ে একে একে ইস্তফা দিয়েছিলেন। সেই সময় সাংসদ কোয়েলও নিজের ইস্তফাপত্র ইমেলের মাধ্যমে উপ-রাষ্ট্রপতি তথা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি. পি. রাধাকৃষ্ণণের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তবে ইমেলের সেই ইস্তফা গ্রহণ না করে উপ-রাষ্ট্রপতি তাঁকে সশরীরে দেখা করার নির্দেশ দেন।
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই রাজ্যসভার সাংসদ পদ লাভ করার মাত্র ২ মাস ১০ দিনের মাথায় কোয়েল সশরীরে গিয়ে সি. পি. রাধাকৃষ্ণণের হাতে নিজের ইস্তফাপত্র তুলে দেন। সংসদ ভবন থেকে বেরোনোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী তথা বিজেপির শীর্ষ সাংগঠনিক নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে দেখা করেন, যা তাঁর পদ্মশিবিরে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাকে একশো শতাংশ নিশ্চিত করে দিয়েছে।
“যেতে চাইলে লোটাকম্বল নিয়ে চলে যান”— ক্ষোভ উগরে দিলেন মমতা
দলে একের পর এক ভাঙন ও কোয়েলের ইস্তফার খবর সামনে আসতেই তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে একটি ফেসবুক লাইভে এসে দলের সমস্ত দলবদলু ও কোণঠাসা নেতাদের সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন:
“যাঁদের যাঁদের যাওয়ার আছে— বিজেপির চাপে, পুলিশ, ইডি, সিবিআই, সিআইডি বা নানা মামলার ভয়ে— তাঁদের হাতজোড় করে বলব, ২১ জুলাইয়ের সভার আগেই যার যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ে নিন। লোটাকম্বল নিয়ে এখনই দল ছেড়ে চলে যান। দয়া করে আমরা যে দলটা এত রক্ত ও কষ্ট দিয়ে তৈরি করেছি, তাকে কলুষিত করবেন না। আপনি দল ছাড়তেই পারেন, কিন্তু তাতে আমরা কোনওভাবেই দুর্বল হব না।”
ঋতব্রত শিবিরে যোগ দিতে পারেন তাপস ও সন্ধ্যারানিও!
বিধানসভায় ৫৮ জন বিধায়কের সই নিয়ে ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে বিরোধী দলনেতার তকমা ছিনিয়ে নিয়েছেন উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন ব্রাত্য বসুর পাশাপাশি আরও বেশ কিছু বড় নাম এই শিবিরে নাম লেখাতে চলেছেন বলে খবর।
তালিকায় থাকা সম্ভাব্য হেভিওয়েট নামসমূহ:
-
তাপস চট্টোপাধ্যায়: রাজারহাটের এই দাপুটে নেতা তথা নিউটাউনের প্রাক্তন বিধায়কের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকদিন ধরেই জল্পনা ছিল। তিনিও ঋতব্রতের জোটে সামিল হতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।
-
সন্ধ্যারানি টুডু: জঙ্গলমহলের মানবাজার এলাকার অত্যন্ত প্রভাবশালী আদিবাসী মুখ তথা প্রাক্তন মন্ত্রী সন্ধ্যারানি টুডুও সম্ভবত কালীঘাটের হাত ছেড়ে ঋতব্রত শিবিরের দিকেই পা বাড়াচ্ছেন।
২১ জুলাইয়ের মেগা সমাবেশের ঠিক চার দিন আগে দলের এই অভূতপূর্ব সাংগঠনিক ভাঙন তৃণমূলের অস্তিত্বকেই এক বিরাট সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







