কলকাতা, ১৬ জুলাই ২০২৬: রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না— আরও একবার তা হাড়হাতে প্রমাণ করে দিলেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র। মঙ্গলবার রাত থেকে যে জল্পনার মেঘ জমছিল তিলোত্তমার আকাশে, বুধবার দুপুরে তা কালবৈশাখীর মতো আছড়ে পড়ল রাজ্য রাজনীতিতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ও ‘কালীঘাট তৃণমূল’-এর সব পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে অবশেষে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরে যোগ দিলেন মদন মিত্র। আর দল ছাড়ার পর দলনেত্রীর উদ্দেশ্যে তাঁর মন্তব্য ঘিরে এখন রীতিমতো তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। প্রায় ধমকের সুরে মদন হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, “রাস্তায় দেখা হবে মমতার সঙ্গে!”
মঙ্গলবার পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মদন মিত্রের স্ত্রী ও দুই পুত্রকে সিজিও কমপ্লেক্সে তলব করে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। আর তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাতে সন্দীপন সাহার বাবা তথা এন্টালির প্রাক্তন বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহার বাড়িতে হাজির হন মদন।
“স্বর্ণদা বিরিয়ানি খেতে ডেকেছিল, তাই গিয়েছিলাম!”— দলবদলের আগে সাফাই মদনের
বুধবার সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় অবশ্য অত্যন্ত হালকা চালে গোটা বিষয়টি ওড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন মদন মিত্র। বিক্ষুব্ধ শিবিরে যোগ দেওয়ার ঠিক আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের চেনা মেজাজে তিনি বলেন:
“আমি স্বর্ণদাকে খুব সম্মান করি। আমি ওই রাস্তা দিয়ে আসছিলাম, তখন স্বর্ণদা বলল— ‘মদন, আজ বিরিয়ানি খাওয়াব।’ স্বর্ণদা বিরিয়ানি খেতে ডেকেছে, তাই গিয়েছি। এটা তো এমন নয় যে ছোটবেলার মতো এই আড়ি আর এই ভাব! আমরা কি কেউ কারও সঙ্গে দেখা করতে পারব না? স্বর্ণদার সঙ্গে আমার এতদিনের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয়। আমি কি ওঁর বাড়ি যেতে পারব না?”
তবে এই ‘বিরিয়ানি কূটনীতি’র আড়ালে যে বড়সড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ছক লুকিয়ে ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। গাড়ি চেপে সোজা বিধানসভায় পৌঁছে তিনি সোজা ঢুকে যান ঋতব্রত শিবিরের ঘরে এবং সেখানে প্রবীণ নেতা আখরুজ্জামানের সঙ্গে একান্তে চূড়ান্ত বৈঠক সারেন।
“আমি এখন বাংলার বিধায়ক”— ফিরহাদ-চন্দ্রিমার পথে মদনও
কয়েকদিন আগেও যিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীক্ষ্ণ ভাষায় আক্রমণ করে মমতার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন, সেই মদন মিত্রের এই ভোলবদলে কার্যত একা হয়ে পড়লেন তৃণমূল সুপ্রিমো। বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের পর দল যখন আড়াআড়ি দু-ভাগ হয়ে যায়, তখন একে একে মমতার দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের সঙ্গী ফিরহাদ হাকিম, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, অরূপ বিশ্বাস, জাভেদ খান এবং বীরভূমের অনুব্রত মণ্ডলের মতো হেভিওয়েট নেতারা উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রতর শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন।
একমাত্র মদন মিত্রই এতদিন কালীঘাটের হাত ছাড়েননি। কিন্তু পরিবারের ওপর এজেন্সির চাপ আসতেই ‘দিদি’র শীতল মনোভাবে মন ভেঙেছে তাঁর। বুধবার পদত্যাগের পর অত্যন্ত চড়া সুরে মদন মিত্র স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমি আর কোনও নির্দিষ্ট দলের বৃত্তে বন্দি নই। আমি এখন এই রাজ্যের বিধায়ক, স্বাধীন বাংলার বিধায়ক।”
তৃণমূলের অন্দরের খবর, একুশে জুলাইয়ের পাল্টা কর্মসূচির আগে মদন মিত্রের মতো একজন দুঁদে সংগঠকের চলে যাওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এক অপূরণীয় ধাক্কা। অন্যদিকে, মদন মিত্রের এই হুঙ্কার প্রমাণ করছে যে, আগামী দিনে ওপার শিবিরের ওপর চাপ আরও বাড়াতে চলেছে ঋতব্রত-অরূপ রায়ের নবগঠিত কমিটি।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







