এলাকায় রুটিন টহলদারির সময় আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের বারাবনি থানার পুলিশের হাতে এল এক বড়সড় সাফল্য। গোপন সূত্রে নয়, বরং পুলিশের নিজস্ব তৎপরতা ও ক্ষিপ্রতায় ভেস্তে গেল একটি আন্তঃরাজ্য লোহা পাচার চক্রের মেগা ব্লু-প্রিন্ট। বারাবনি থানার দোতারমা মোড়ের কাছে ব্যারিকেড করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ লোহা বোঝাই দুটি পিকআপ ভ্যান এবং পাচারকারীদের এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়া একটি সাদা রঙের চারচাকা লাক্সারি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় যুক্ত থাকার অপরাধে চালক ও খালাসি সহ মোট ১০ জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার ধৃতদের আসানসোল জেলা আদালতে পেশ করা হলে, বিচারক মামলার গুরুত্ব এবং এই চক্রের শিকড়ে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে ৫ মূল অভিযুক্তকে ৭ দিনের পুলিশি রিমান্ডের (Police Remand) নির্দেশ দেন। বাকি ৫ জনকে ১৪ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে (জেল) পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
মাঝরাতে ধাওয়া, ‘দোতারমা মোড়ে’ খাঁড়া পাতল পুলিশ:
বারাবনি থানা সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (২৭ মে) রাত আনুমানিক ৯টা নাগাদ থানার একটি বিশেষ পুলিশ দল চুরুলিয়া ও সংলগ্ন এলাকায় রুটিন রাউন্ডে ছিল। সেই সময় চুরুলিয়ার দিক থেকে দুটি পিকআপ ভ্যান অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এবং বেপরোয়াভাবে আসানসোলের দিকে আসতে দেখা যায়। সন্দেহ বাড়ায় পিকআপ ভ্যান দুটির ঠিক পেছনে থাকা একটি রাজকীয় সাদা রঙের চারচাকা গাড়ির গতিবিধি দেখে। গভীর রাতে এই তিনটি গাড়ির কনভয় এবং সন্দেহজনক গতি দেখে বারাবনি থানার ডিউটি অফিসার কালক্ষেপ না করে ওয়ারলেসের মাধ্যমে দোতারমা মোড়ের পুলিশ বুথকে সতর্ক করেন।
পুলিশের গাড়িটি ধাওয়া করে এবং দোতারমা মোড়ের কাছে তড়িঘড়ি ব্যারিকেড দিয়ে তিনটি গাড়িকেই চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে আটকে দেওয়া হয়।
কাগজ দেখাতে না পারায় জেরা, মিলল বিপুল চোরাই লোহা:
গাড়িগুলি আটকানোর পর পুলিশ চালক ও ভেতরে থাকা আরোহীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। এত রাতে কোথা থেকে গাড়ি আসছে এবং কোথায় যাচ্ছে, তার কোনও সন্তোষজনক বা যুক্তিযুক্ত উত্তর দিতে পারেনি আরোহীরা। এরপর পুলিশ পিকআপ ভ্যানের ডালা খুলতেই চোখ কপালে ওঠে তদন্তকারীদের। ভ্যান দুটির ভেতর থরে থরে সাজানো রয়েছে বিপুল পরিমাণ ভারী লোহা, যার বাজারমূল্য লক্ষাধিক টাকা।
এই লোহার স্বপক্ষে কোনও চালান, ই-ওয়ে বিল বা বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাওয়া হলে পাচারকারীরা সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে যায়। এর পরেই পুলিশ গাড়ি তিনটি সহ ১০ জনকে আটক করে বারাবনি থানায় নিয়ে আসে এবং লোহার কোনও বৈধ উৎস না মেলায় রাতেই নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে ১০ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে।
৫ মূল পান্ডা ৭ দিনের পুলিশি হেফাজতে, নেপথ্যে কোন রাঘববোয়াল?
এই লোহা সিন্ডিকেটের জাল কতদূর বিস্তৃত, এই বিপুল লোহা আসানসোল-রানিগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের কোনও রাষ্ট্রায়ত্ত বা বন্ধ কারখানা থেকে কেটে চুরি করা হয়েছে কি না, তা জানতে ধৃতদের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায় পুলিশ। আদালত সমস্ত নথিপত্র খতিয়ে দেখে ৫ মূল অভিযুক্তকে ৭ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
রিমান্ডে নেওয়া ৫ মূল অভিযুক্ত হলেন:
-
কান্নাইয়া কুমার মাহাতো
-
গঙ্গা রাম
-
প্রমোদ মাহাতো
-
অমল মন্ডল
-
দিনেশ পাল
বাকি ৫ সহযোগীকে আদালত জেল হেফাজতে পাঠিয়েছে। বর্তমানে বারাবনি থানার লক-আপে রেখে রিমান্ডে পাওয়া এই ৫ আসামিকে দফায় দফায় ম্যারাথন জেরা করছেন দুঁদে পুলিশ আধিকারিকরা। এই বিপুল পরিমাণ চোরাই লোহা আসানসোলের কোন গোপন স্ক্র্যাপ গুদামে বা ভিন রাজ্যে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং এর পেছনে কয়লা ও বালি মাফিয়ার মতো কোনও রাঘববোয়াল বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক মাথার যোগসূত্র রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখে মূল চক্রীকে খাঁচায় পুরতে মরিয়া বারাবনি থানার পুলিশ।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







