পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহ এখনও কাটেনি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ অসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে ওয়াশিংটন। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তেলের বিপুল ভাণ্ডারের মালিক সৌদি আরব কেন পরমাণু শক্তির দিকে এতটা আগ্রহী?
চুক্তি অনুযায়ী, সৌদি আরব অসামরিক উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। সৌদি সরকারের দাবি, এই কর্মসূচির লক্ষ্য শুধুই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো, এর সঙ্গে সামরিক উদ্দেশ্যের কোনও সম্পর্ক নেই।
তবে এই ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয় রয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের একাংশের। কারণ, এর আগেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরান যদি কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও সেই পথেই হাঁটবে। ফলে অসামরিক কর্মসূচির আড়ালে ভবিষ্যতের কৌশলগত প্রস্তুতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
কেন পরমাণু শক্তির দিকে ঝুঁকছে সৌদি?
সৌদি আরবের অর্থনীতি এখনও মূলত অপরিশোধিত তেল রপ্তানির উপর নির্ভরশীল। ২০২২ সালে দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশই এসেছে তেল খাত থেকে। কিন্তু যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার লক্ষ্য তেলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করা।
বর্তমানে সৌদি আরব নিজেদের উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনেই ব্যবহার করে। যদি সেই বিদ্যুতের বড় অংশ পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদন করা যায়, তাহলে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য কম তেল খরচ হবে। ফলে অতিরিক্ত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই বাজেট ঘাটতির সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে রিয়াদ। গত এক দশকে মাত্র একবার বাজেট উদ্বৃত্ত হয়েছে, বাকি সময়ে ঘাটতি সামলাতে হয়েছে। তাই বিকল্প জ্বালানি ও উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগকে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে সৌদি প্রশাসন।
ইরান ফ্যাক্টর কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিও এই সিদ্ধান্তের বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সৌদির উদ্বেগ বহুদিনের। তাই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রযুক্তি নিজেদের হাতে রাখা ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার প্রচেষ্টা বলেই মনে করা হচ্ছে।
নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
চুক্তিটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্দরেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের একাংশের আশঙ্কা, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সামরিক কাজে ব্যবহারের ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের যুক্তি, সৌদি আরবকে পাশে রাখলে চীন বা রাশিয়ার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে আরও বাড়ার সম্ভাবনা কমবে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের এই পদক্ষেপ আপাতত অসামরিক জ্বালানি কর্মসূচির অংশ হলেও, এর দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে নজর রয়েছে গোটা বিশ্বের।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







