কলকাতা, ১৩ জুলাই ২০২৬: কলকাতা পৌরনিগমের (KMC) নাগরিকদের নাগরিক পরিষেবা আরও সুনিশ্চিত ও দ্রুত করতে এবার এক ঐতিহাসিক প্রশাসনিক সংস্কারের পথে হাঁটল নতুন পুরবোর্ড। কলকাতার বর্তমান ১৪৪টি ওয়ার্ডের পুনর্বিন্যাস (Delimitation) এবং ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়িয়ে অন্তত ২০০টি করার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। এই কাজের গতি বাড়াতে রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা মেনে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জোড়া কমিটি’ গঠন করেছে পুর প্রশাসন, যার সরকারি বিজ্ঞপ্তিও আজ প্রকাশিত হয়েছে।
গত মাসে কলকাতা পুরসভার একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, কলকাতার বিপুল জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্বিন্যাস এবং ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানো উচিত, যাতে প্রতিটি নাগরিক সমানভাবে পুর পরিষেবা পান। মুখ্যমন্ত্রীর সেই দূরদর্শী প্রস্তাবকে মান্যতা দিয়েই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করল কলকাতা পৌরনিগম।
কীভাবে কাজ করবে ‘জোড়া কমিটি’?
পুরপ্রশাসক স্মিতা পাণ্ডের নির্দেশ অনুযায়ী, পুনর্বিন্যাসের জটিল আইনি ও ভৌগোলিক প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে দ্বি-স্তরীয় পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে:
-
শহরভিত্তিক কেন্দ্রীয় কমিটি: এটি একটি সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটি। ১০ সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের কমিটিতে কলকাতা উত্তর এবং কলকাতা দক্ষিণ— এই দুই জেলার ‘ডিস্ট্রিক্ট ইলেকশন অফিসার’ (DEO)-দের আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এই কমিটি মূল রূপরেখা তৈরি করবে।
-
বরোভিত্তিক কমিটি: কলকাতার প্রতিটি বরো (Borough) এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও বুথ বিন্যাস খতিয়ে দেখতে প্রতি বরোভিত্তিক পৃথক পৃথক সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে।
৫৮ বনাম ৪৯ নম্বর ওয়ার্ড: কেন পুনর্বিন্যাসের এই জরুরি সিদ্ধান্ত?
কলকাতা পুরসভার অধীনে বর্তমানে ১৪৪টি ওয়ার্ড এবং ১৬টি বরো রয়েছে। কিন্তু বাম আমল ও পরবর্তী তৃণমূল জমানার পর থেকে বিভিন্ন ওয়ার্ডের জনসংখ্যা ও বুথ বিন্যাসের মধ্যে এক বিশাল বৈষম্য ও অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে উদাহরণ হিসেবে দুটি ওয়ার্ডের বাস্তব পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে:
-
৫৮ নম্বর ওয়ার্ড (এন্টালি): এই ওয়ার্ডের বর্তমান ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। এখানকার বর্তমান কাউন্সিলর তথা এন্টালির তৃণমূল বিধায়ক সন্দীপন সাহা। এত বিশাল জনসংখ্যার জন্য একজন কাউন্সিলরের পক্ষে সমবণ্টনে পরিষেবা দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
-
৪৯ নম্বর ওয়ার্ড: এর ঠিক বিপরীত ছবি দেখা যাচ্ছে প্রবীণ বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠকের এই ওয়ার্ডে। এই বিস্তীর্ণ ওয়ার্ডের মোট ভোটার সংখ্যা মোটে ৯ হাজার।
ভোটার এবং জনসংখ্যার এই বিপুল তারতম্য দূর করতেই মূলত এই সীমানা পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত।
প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
নবান্ন ও পুর প্রশাসন সূত্রের খবর, ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের এই কাজের জন্য উপগ্রহ মানচিত্র এবং সাম্প্রতিক ভোটার তালিকার সাহায্য নেওয়া হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডের গড় ভোটার সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক সমতার মধ্যে নিয়ে আসাই এই কমিটির মূল লক্ষ্য।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস এবং ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০০ করার এই মাস্টারস্ট্রোক আগামী কলকাতা পুরভোটে শহরের রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পুর পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি তিলোত্তমার বুকে নতুন এক প্রশাসনিক যুগের সূচনা হতে চলেছে এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







