কলকাতা, ১৮ জুলাই ২০২৬: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যে মহাধস নেমেছে, তা যেন থামার নামই নিচ্ছে না। ব্রাত্য বসু, তাপস চট্টোপাধ্যায়, সন্ধ্যারানি টুডুদের পর এবার ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রকাশ্যে এলেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা ডোমজুড়ের হেভিওয়েট নেতা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি এখনও শ্রদ্ধা বজায় রাখলেও, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আক্রমণ শানিয়েছেন তিনি। নিজের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মমতা-অভিষেকের ছবি সরিয়ে দিয়ে রাজীব যেভাবে মুখ খুলেছেন, তাতে রাজনৈতিক মহলে তীব্র জল্পনা— তবে কি তিনি আবারও বিজেপির পথে পা বাড়াচ্ছেন?
ফেসবুকের কভার ছবি বদল: ‘মানুষের সাথে, মানুষের পাশে’
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে একেবারে আড়ালে চলে গিয়েছিলেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। ডেবরা আসনে পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে শনিবার হঠাৎই সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হন তিনি।
তার ফেসবুক প্রোফাইলের প্রধান বদল ও বার্তা:
-
নেতাদের ছবি দলবদল: নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের কভার ছবি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি এক ঝটকায় সরিয়ে দেন রাজীব।
-
নতুন বার্তা: সেখানে তিনি স্থান দেন নিজের একটি একক ছবি, যার ওপর লেখা রয়েছে— “মানুষের সাথে, মানুষের পাশে”। রাজনৈতিক মহলের মতে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার এটিই ছিল ওঁর প্রথম প্রকাশ্য পদক্ষেপ।
“দিদি কেন এখনও অভিষেকের হাত ধরে আছেন?”— বিস্ফোরক রাজীব
ফেসবুকে ছবি বদলানোর পরপরই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দেন এই প্রাক্তন মন্ত্রী।
অভিষেক ও দল পরিচালনা নিয়ে রাজীবের বিস্ফোরক বক্তব্যসমূহ:
“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশেপাশে থাকা প্রায় সমস্ত নেতাই এখন বলছেন যে অভিষেক থাকলে তাঁরা আর এই দল করবেন না। অভিষেক যদি সরে যান, তবে সবাই আবার একজোট হয়ে দিদির পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত। কিন্তু আমি এটাই বুঝতে পারছি না যে, দলটা চোখের সামনে শেষ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দিদি কেন এখনও অভিষেকের হাতটা এভাবে ধরে আছেন? এটা শুধু আমার বা কয়েকজন নেতার কথা নয়, তৃণমূল কংগ্রেসের অগণিত সাধারণ মাঠের কর্মীদের মনের কথা।”
রাজনীতিতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, “রাজনীতি করা তো মানুষের কাজ করার জন্য। সেই কাজটাই যদি স্বাধীনভাবে না করতে পারি, তবে আর কেন এই দলে থাকব?”
কেরিয়ার ধ্বংস ও আইপ্যাকের বিরুদ্ধে টিকিট বিক্রির অভিযোগ
অভিষেকের জেদের কারণেই তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন রাজীব। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডোমজুড় থেকে বিপুল ভোটে জেতার পর, ২০২১-এর ভোটের আগে তিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছিলেন। সেবার ডোমজুড়ে হেরে যাওয়ার পর ফের তৃণমূলে ফেরেন। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে তাঁর নিজের ‘গড়’ ডোমজুড় থেকে সরিয়ে তাঁকে সম্পূর্ণ অচেনা ডেবরা আসনে প্রার্থী করেন মমতা ও অভিষেক।
পরাজয় ও দলের রণকৌশল নিয়ে তাঁর অভিযোগ:
-
জেদ করে আসন বদল: ডেবরায় জেতার জন্য রাজীব আপ্রাণ লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে বিজেপি প্রার্থী হইহই করে জয়লাভ করেন। রাজীবের অভিযোগ, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার রাজনৈতিক কেরিয়ার এবং পরিবারকে সম্পূর্ণ শেষ করে দিয়েছে।”
-
আইপ্যাক-কে তোপ: দলের এই ঐতিহাসিক পরাজয়ের পেছনে ভোটকুশলী সংস্থাকে দায়ী করে তিনি বলেন, “আইপ্যাক এবং অভিষেক মিলে দলের যেসব আসন অন্য লোকেদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল, সেখানেই তৃণমূলের প্রার্থীরা সবচেয়ে খারাপভাবে হেরেছেন।”
২১ জুলাইয়ের মেগা সমাবেশের ঠিক তিন দিন আগে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং বিজেপির দিকে ঝুঁকে থাকার ইঙ্গিত কালীঘাটের ওপর চাপ আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিল।
Author: Supravat Bangla
PRGI Approved - WBBEN/25/A1519







